“জাতের নামে বজ্জাতি সব / জাত জালিয়াত খেলছ জুয়া”

বিষণ্ণতার সঙ্গে কলমে উঠে আসছে চিরপরিচিত সেই প্রাণের কবি নজরুলের কথা। লিখতে বসেছি শ্রীমতি গৌরী লঙ্কেশ এর কথা। হ্যাঁ শ্রীমতি লিখলাম । ঈশ্বর গৌরী লঙ্কেশ নন। তিনি ঈশ্বর নন মানবী, আমাদের সাধারণ মানবের মাঝে এক মহান মানবী।সত্যি কথাটা স্বীকার করে ফেলি প্রথমেই। তাঁকে চিনতাম না আমি কারণ থাকি বাংলায় লিখি বাংলায় পোমোটারের দৌরাত্ম্যি বাড়ল কমল কি না, আলুর দাম পোনের না পোচিশ কিংবা তিনোমূল সিপিএম বিজেপি ইত্যাদি নিয়ে আলাপ আলোচনায় ব্যস্ত থাকি। গোটা ভারতে কে কোথায় কী কাজ করে চলেছেন তার হদিশ রাখতে যাব কেন মশাই? কিন্তু তারপরেও সব মানুষ কূপমণ্ডূক নন। কিছু মানুষ আদর্শকে বুকে ধরে রাখেন। জীবন যাপন করেন আদর্শের শিখাটি প্রজ্জ্বলন্ত রেখে।সেরকমই এক মানুষ গৌরী লঙ্কেশ। তাঁর নামটিতেই অদ্ভুত এক স্ববিরোধ! যেন দুটি বিপরীত ধারাকে একত্রে রাখার লড়াই। নামে তিনি আর্য দেবী দুর্গা আর পদবী তাঁর অনার্য রাজ লঙ্কাধিপতি রাবণের নাম। এ কদিনে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার সূত্রে সকলেই জেনে গেছেন মানুষটি নিজের বাড়ির দোরগোড়ায় মারা গেছেন অজ্ঞাতনামা আততায়ীর গুলিতে। অনেকটা এমন মৃত্যুই দেখেছিল গোটা দেশ আজ থেকে বহু বছর আগে ১৯৮৪ সালে। সেদিন মুহূর্তে দাঙ্গা লেগে গিয়েছিল রাজধানীতে, গোটা দেশ থমথমে, কয়েকদিনের রাষ্ট্রীয় শোক , তারপর চন্দন কাঠে মৃতদেহ সৎকারের লাইভ টেলিকাস্ট সম্প্রচারকের ভেজা কন্ঠের ধারাবিবরণী সহ। রাষ্ট্রীয় শোক শব্দটিকে কেমন যেন ব্যুরোক্র্যাটিক মনে হল আজ। যে শোকে দাঙ্গা লাগে সেই তবে রাষ্ট্রীয় শোক? যে শোকে স্বাধীনতাকামী লাখ লাখ মানুষ রাগে ফেটে পড়ে, মিছিল করে, চোখে জল নিয়ে বুকে ব্যাজ আঁটে “আই অ্যাম গৌরী”, স্বতঃস্ফূর্ত ধিক্কারে ছেয়ে যায় অজ্ঞাতকারী দুষ্কৃতীর বিরুদ্ধে মানুষের স্বর- সে তবে রাষ্ট্রব্যাপী শোক নয়?  হিমালয় কন্যা গৌরীর মতই যেন অটল সদৃশ বাবা পি লঙ্কেশের জ্যেষ্ঠা কন্যা গৌরী শিশুকাল থেকেই যেন প্রকৃত অর্থে ‘বাপ কী বেটি’। চিন্তক, আগুনসদৃশ লেখক পি লঙ্কেশ আসলে অজান্তেই মেয়ের ভেতরে সঞ্চারিত করেছিলেন তাঁর আদর্শের বীজ। ন্যায়ের দাবীতে, অন্ত্যজের উন্নতির আশায়, জাতপাতের ভেদাভেদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকার বিরুদ্ধে সাম্যের সাধনার উদ্দেশ্যে সাংবাদিকতার যে ঐতিহ্য তিনি রোপণ করেছিলেন কন্নড়া সমাজে বিংশ শতকে তত বড় কাজ খুব বেশি হয় নি সে ভাষাভাষীর রাজ্যে। বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পরে গৌরী সে দায় নিজের কাঁধে তুলে নেন। কন্নড় ভাষায় এক বিজ্ঞাপনহীন ট্যাবলয়েড সংবাদপত্র বের করার দায়। স্রেফ আদর্শের কারণে এত বড় ঝুঁকি যিনি নেন এ স্বার্থান্ধ নব্য দুনিয়ায় এমন মানুষ কোথায় পাই? স্রেফ নিউজ স্ট্যান্ডের বিক্রিতে তাঁর পত্রিকা চালানোর খরচ তুলতেন তিনি। অথচ কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সহ সব উঁচু মহলে মানুষগুলোর সঙ্গে কাজের সূত্রে বা বাবার সূত্রেই কতই না জানাশোনা ছিল। কিচ্ছু সাহায্য নেন নি জীবৎকালে, আলোক বর্তিকার মত হাতে ধরা ছিল স্রেফ আদর্শের মশাল। মৃত্যু পরবর্তী বিভিন্ন স্মৃতিচারণা থেকে জানতে পারি এক কাগজ চালানোর ব্যাপারেও কিভাবে লড়াই করতে হয়েছিল তাঁকে! ষোল বছর বেশ কটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্রে চাকরি করার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি হঠাত করেই ‘লঙ্কেশ পত্রিকে’র ভার নেন বাবার আকস্মিক প্রয়াণে। কিন্তু তাই বলে কোন আপোষে তিনি রাজী ছিলেন না। শিশুপুত্রের স্কুলে ভর্তি করানো থেকে অফিসের কাজে অবৈধ টাকা নেওয়া পর্যন্ত যে কম্প্রোমাইজ আমাদের অনেকের প্রত্যেকদিন করতে হয় সেই নিরাপদ সরীসৃপ জীবনের মুখে থুতু ছুঁড়ে জান কবুল করেছিলেন তিনি।

ছোটবেলা থেকে জেনেছি মনের কথা মুখে প্রকাশ করতে পারাই হল গণতন্ত্রের জয়। আমাদের ‘প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য’ আর ‘আধুনিক বৃহত্তম গণতন্ত্রের’ সুমহান ঢ্যাঁড়া পিটোনোর ঢক্কানিনাদে খেয়াল করি নি কি ভাবে একের পর এক দাভোলকর, কালবুর্গি, গৌরীরা বিসর্জিত হয়ে যাচ্ছেন । এ কী ভয়ংকর হিংস্রতা শান্ত দেশটিতে! কী জঘন্য চক্রান্ত বিভেদের! ইংরেজ আমাদের দুশো বছর পরাধীন করতে পেরেছিল আমাদের রাজ্যগুলির মধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহ আর ধর্মের বিভেদের ভয়ংকর খেলা খেলে। এই ভারতের মূলবাসী রাজনীতিকরা সেই বিভেদের রাজনীতিই মাত্রাছাড়া পর্যায়ে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। তারা কি তবে অনন্ত আগামীতে ক্ষমতায় থেকে যেতে চাইছে? বিরুদ্ধ মত মানেই যদি গলা টিপে দেওয়া হয় তাহলে পেশির জয়ই এ সমাজের ভবিতব্য হয়ে দাঁড়ায়। এই যে এত শ্লোক টোক গিলে এলাম “বলং বলং বাহুবলং/ নির্বুদ্ধিস্য কুতো বলং” কিংবা “বুদ্ধির্যস্য স জীবতি” এগুলি কি তাহলে জাদুঘরে রাখা হবে? বুদ্ধি মননের শ্রেষ্ঠত্ব মুছে দিয়ে পশুবল স্থায়ী হবে? আমরা কি দ্রুত পেছনের দিকে এগিয়েই যাব বাসের মত?

হতাশ হতে চাইলে নির্বীর্য হতে চাইলে চারপাশে অজস্র কারণ ছড়িয়ে রয়েছে। তবু প্রতিদিন জন্ম হচ্ছে মৃত্যু হচ্ছে আবার চাকা ঘুরছে দিনের পরে রাতের পরে দিন। জীবনে যাপন করাটাই আদর্শের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ বলে জেনেছি। গৌরীর মৃত্যুতে মোমবাতি জ্বালানো বা “আই অ্যাম গৌরী” বলাটুকুই নয়, সত্যিকারের আগুন জ্বলে উঠুক প্রতিটি চেতনে। মা দুর্গার মতই যেন দশমীর বিসর্জনের পরেও আবার ফিরে ফিরে আসেন গৌরীরা এই প্রার্থনাটুকু রইল।

Jaya Choudhury

জয়া চৌধুরী মূলতঃ অনুবাদক। মূল স্প্যানিশ ভাষা থেকে বাংলায় প্রকাশিত এতাবৎ পাঁচটি অনূদিত বই ও বাংলায় যৌথভাবে একটি মৌলিক কবিতার বই। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় নিয়মিত অনুবাদ করে থাকেন। অবসরে প্রবন্ধ ও কবিতা লেখেন বাংলায়। সেগুলিও নিয়মিত প্রকাশিত হয় বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও ব্লগে। প্রিয় শখ হলো নাটক করা। স্প্যানিশ ভাষা শেখান রামকৃষ্ণ মিশন স্কুল অফ ল্যাঙ্গুয়েজ এবং শিবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

More posts by the author

The beliefs, views and opinions expressed in this article are those of the author and do not necessarily reflect the opinions, beliefs and viewpoints of Soi or official policies of Soi.