প্রথম দৃশ্য
দিব্য ।। মাসি, ঐ লাল চুড়িটা দাও...
পিউ ।। ওমা... এই তো এতগুলো চুড়ি পরেছিস, আবার লালটাও চাই?
দিব্য ।। দাও না...
পিউ ।। নে বাবা নে। কই দেখি? বাঃ কী সুন্দর দেখাচ্ছে আমার সোনাকে।
অ্যাই দিদি দেখ দেখ... চুড়িগুলো পরে কী মিত্তি দেখাচ্ছে আমার পুচকুটাকে।
দিব্য-র মা ।। ও কী পিউ... তুই দিব্য-কে চুড়ি পরিয়েছিস কেন? খুলে ফেল এক্ষুনি...
পিউ ।। কেন? কী হয়েছে? ও চুড়ি পরতে যে খুব ভালবাসে। তাই তো পরিয়েছি। (স্নেহসূচক দৃষ্টিতে তাকায় বোনপোর দিকে)
দিব্য-র মা ।। (রেগে ছেলের হাত থেকে চুড়িগুলো খুলতে খুলতে -) ওর নাহয় ছ'বছর বয়স। তোরও কি তাই পিউ? একটু জ্ঞানগম্যিও নেই তোর? দিব্য-কে মেয়ে সাজাবার এত শখ কেন? আর এ-ছেলেও হয়েছে সেইরকম, খালি যত মেয়েলি জিনিসে ঝোঁক। বড় হয়ে হোমো-টোমো হবে কিনা কে জানে?
পিউ ।। কেন দিদি, তুই যে আমায় ছোটবেলায় খালি ছেলে সাজাতিস!! ধুতি পরাতিস, গোঁফ এঁকে দিতিস... তার বেলা?
দিব্য-র মা ।। সে তো ছেলে সাজা, আর এ তো মেয়ে! দুটো কি এক হল?
পিউ ।। সেই... একটা মেয়ের ছেলে হয়ে উঠতে পারাটা তো গর্বের কথা, আর একটা ছেলের মেয়ে হয়ে ওঠা... ও বাবা... বড় লজ্জার... তাই না দিদি?

দ্বিতীয় দৃশ্য
সৌম্যেন ।। হ্যাঁরে রূপম, তুই ঘরদোর এত গুছিয়ে রাখিস কী করে রে? সত্যি, তোর কাজকর্মগুলো একদম মেয়েদের মতো। এক্কেবারে পাকা গিন্নি তুই। হা হা ...
রূপম ।। কেন ছেলেরা বুঝি গুছিয়ে কাজ করে না?
সৌম্যেন ।। করবে না কেন? কিন্তু তোর মতো এত নিখুঁত নয়।
রূপম ।। এটা তো প্রশংসার কথা। তা শুধুশুধু গাল দিয়ে ‘মেয়েদের’ মতো বলছিস কেন?
সৌম্যেন ।। তা বাপু, তুমি তো একটু মেয়েদের মতনই। নিখুঁত কাজকর্মের কথা নাহয় ছেড়েই দিলাম। কোনো দুঃখের কথা শুনলে, ভাল গান শুনলে কেঁদে ফেলিস। আমরা রাস্তাঘাটে যেখানে সুবিধে হালকা হতে দাঁড়িয়ে পড়ি, তোমার আবার বন্ধ দরজার বাথরুম ছাড়া পোষায় না। সেদিন বাসে লোকটা তোর পা মাড়িয়ে, উলটে তোকেই ভুলভাল বলতে লাগল আর তুই কিনা মালটাকে খিস্তি না দিয়ে চুপচাপ ওখান থেকে সরে এলি। তুই সালা ‘মেয়েদেরও অধম’।

তৃতীয় দৃশ্য
সৃজা ।। অ্যাই তোরা কেউ অর্ক-কে দেখেছিস? (বন্ধুদের থেকে নেতিবাচক উত্তর পেয়ে সৃজা এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে অর্ক-কে একটা গাছতলায় চুপ করে বসে থাকতে আবিষ্কার করে।) কীরে! তুই এখানে বসে? কখন থেকে তোকে খুঁজছি। (অর্ক কোনো জবাব দেয় না।) কীরে হাঁদা? কী হল? চুপ করে কেন?
অর্ক ।। সৃজা, আমি আর অমিত যে এনগেজড সেটা জেনে তুই কি আমায় ঘেন্না করিস?
সৃজা ।। (কিঞ্চিৎ বিস্মিত হয়ে-) মানে কী? তোরা এনগেজড তাতে আমার কী অসুবিধে? আমি তো তোদের দুজনের কারুরই প্রেমে পড়িনি যে একজন হাতছাড়া হয়ে গেল বলে ফ্রাস্টু খাব !
অর্ক ।। ইয়ার্কি নয় সৃ, আমরা ছেলে হয়ে একে-অপরকে ভালবাসি –এটা জেনে তুই কি আর আমার বন্ধু থাকবি না?
সৃজা ।।কী হয়েছে বল তো তোর? এত সেন্টি দিয়ে কথা বলছিস কেন আজ?
অর্ক ।। জানিস, আমার ছোটবেলার সবচেয়ে কাছের বন্ধু আমি ‘গে’ জানার পর আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করছে যেন আমি কোনো ভয়ংকর ছোঁয়াচে রোগে ভুগছি। কিংবা রেপ বা খুনের মতো কোনো জঘন্য অপরাধ করে বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছি। অন্য ছেলেরাও আমায় দেখলেই অ্যাভয়েড করছে। আমার সেই বন্ধু বলে কিনা –তুই ডাক্তার দেখা। চিকিৎসা করালেই সেরে যাবে। ইদানীং এই রোগ নাকি খুব দেখা যাচ্ছে... হোয়াট রাবিশ! এ কি ডেঙ্গু না ম্যালেরিয়া যে চিকিৎসা করাতে হবে?
সৃজা ।। মন খারাপ করিস না অর্ক। তুই নিজে জানিস তুই ঠিক। আমরা, তোর সত্যিকারের বন্ধুরা জানি তুই আমাদেরই মতো স্বাভাবিক। ব্যাস্ হয়ে গেল। এবার ওঠ। ক্লাসে দেরি হয়ে যাবে যে...

----

তিনটে ঘটনাই আমাদের খুব পরিচিত। আলাদা হয়েও কোথাও যেন তিন ঘটনার মূল সুরটি এক। আমরা যারা তথাকথিত শিক্ষিত, উদার, আলোকপ্রাপ্ত, তারাও কি ছেলেরা চুড়ি পরলে, বেশি সংবেদনশীল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লজ্জাশীল হলে, জীবনসঙ্গী হিসেবে সমলিঙ্গের কাউকে বেছে নিলে – এটাকে স্বাভাবিক ঘটনা বলে মেনে নিই? সমকামিতার পক্ষে, নারীর সমানাধিকারের পক্ষে যতই বড় বড় কথা বলি না কেন, কোনো ছেলে নারীসুলভ গুণেরবা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হলে ভেতরে ভেতরে ভীষণ ভয় পেয়ে যাই। "আমার মেয়ে একাই ছেলেদের মতো কাজ করে" – এটা বলার মধ্যে গর্ব অনুভব করি। কিন্তু ছেলের মধ্যে মেয়ের বৈশিষ্ট্য থাকলে তা গোপন করার চেষ্টা করি। মেয়ের ছেলে হয়ে ওঠা আর ছেলের মেয়ে হয়ে ওঠার মধ্যে আসমান-জমিন ফারাক। যে ছেলেটি অকারণ ম্যাচোগিরি না দেখিয়ে শান্তির পথ বেছে নেয় অথবা পুরুষ হওয়ার প্রধান শর্ত 'নির্লজ্জতা'-কে বর্জন করে তাকে 'মেয়েদেরও অধম' ট্যাগ পেতে হয়। সেই ছেলেটি নিজেও 'মেয়ে' হওয়াকে গালাগাল মনে করে প্রকৃত 'পুরুষ' হয়ে ওঠবার জন্য কোমর বেঁধে লেগে পড়ে।

কেউ লেসবিয়ান বা গে, একথা শুনলেই ছেলেরা ছেলেটিকে ও মেয়েরা মেয়েটিকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে। যেন হোমোসেক্সুয়ালবলেই তিনি ছেলে দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়বেন আর লেসবিয়ান হলে মেয়ে দেখলেই। যাঁরা স্ট্রেট, তাঁরা কি বিপরীত লিঙ্গের যতজনকে দেখেন সবার ওপর হামলে পড়েন, না নিজের নিজের পছন্দ অনুযায়ী সঙ্গী বাছেন? কিন্তু 'সমকামিতা' শব্দটি শুনলেই আমাদের যুক্তি-বুদ্ধি কাজ করে না। এটা যে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার আমরা তা মানতে পারি না। ভিনগ্রহের প্রাণী ভেবে অদ্ভুত সব বৈশিষ্ট্য তাঁদের ওপর চাপিয়ে দিই। আমার নীল রং পছন্দ স্টেসি-র সবুজ, আব্বাস-এর ঋত্বিক ঘটক তো নীলাভ্র-র সত্যজিৎ, জীবনসঙ্গী হিসেবে তেমনই একটি ছেলের ছেলেকেই পছন্দ করাও তো আসলে স্বাভাবিক একটা চয়েস মাত্র – এটা ভাবতে আমরা এখনও শিখিনি।

নিজের দেশে, নিজের সমাজে এবং সবচেয়ে বড় কথা নিজের বাড়িতে আপনজনদের কাছেও এইসব তথাকথিত 'পুরুষ' হয়ে উঠতে না পারা মানুষেরা আজও উদ্বাস্তুর জীবন কাটাচ্ছেন। প্রতিদিন রাস্তাঘাটে, বন্ধুমহলে, সিনেমার কমিক চরিত্রায়নের মধ্যে দিয়ে নিষ্ঠুর ব্যঙ্গের শিকার হয়ে চলেছেন।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন – মানুষ দেশলাই কাঠি নয় যে একটি বাক্সের খোপে ঢোকানোর জন্য সবাইকে এক মাপের হতে হবে। কিন্তু আমরা প্রতিনিয়ত মানুষকে দেশলাই কাঠি বানানোরই চেষ্টায় নিয়োজিত। মানুষকে স্রেফমানুষ হিসেবে দেখার শিক্ষাটা এখনও অধরাই রয়ে গেল আমাদের।

Sayori Mukhopadhyay

Sayori Mukhopadhyay is a thespian, loves to watch films and read thrillers.She is a post-graduate in Film Studies as well as Bengali from Jadavpur University.


The beliefs, views and opinions expressed in this article are those of the author and do not necessarily reflect the opinions, beliefs and viewpoints of Soi or official policies of Soi.