-"কই গোওওও ! কে আচিস দরজাটা খোল দেকি ! ঘরে রাজকুমার এল আর আমাদের প্রজাদের উপহার দিতে হবে না?"

দরজায় দুমদুম করে ধাক্কা দিয়ে, হাতে চটাপট কয়েকটা তালি বাজায় রাণী। তারপর, ব্যাগ থেকে ছোটো হাত আয়নাটা বার করে সেটা মুখের সামনে ধরে। সস্তার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে টকটকে লাল রঙের লিপস্টিকটা বার করে ঠোঁটে ঘষতে থাকে। চুমকি বসানো চকচকে শাড়ি, লটকান ঝোলানো ব্লাউজ, চোখে গোলাপি আইশ্যাডো, পার্ম করা কোঁকড়ানো ফলস চুল। উগ্র মেক-আপের সাথে মানানসই লিপস্টিকের শেডটা।

নীচু স্বরে বিড়বিড় করে আয়নার ওপারের ছবিটার সাথে,
-“সব শালা বড়লোকি চাল! বাচ্চা বিয়োবে লাখ লাখটাকা দিয়ে নামজ্যাদা নার্সিংহোমে। আর আমাদের সাতে হাজারটাকা নিয়ে এক ঘন্টা দরদাম করবে। এদের জন্য শালা খিস্তি খেউরই ওষুধ।
হত তোদের ঘরে আমাদের মত বাচ্ছা, বুঝতিস কত ধানে কত চাল।”

বেশ খানিকক্ষণ পর দরজাটা ধীরে ধীরে ফাঁক হয়ে দেখা যায় একটি পুরুষ অবয়ব। রাণী আয়না থেকে চোখ না সরিয়ে একটু ঝেঁঝে ওঠে -

"বাব্বা ট্যাকা বার করার নামে যে আর টুঁ-শব্দটি নেই দেকি...."

আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল কড়া করে ঠিক তখনই আয়না থেকে চোখটা সরিয়ে তাকায় সামনের জনের দিকে। একহাতে মাউথ অর্গ্যান একটা আর অন্য হাতে দরজার পাল্লাটা ধরে হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে একটি বছর কুড়ি বাইশের ছেলে। পরণে বারমুডা, আর একটা সাদা-কালো টি-শার্ট। সামনের দিকেই চেয়ে আছে কিন্তু ঠিক রাণীর দিকে নয়। রাণীকে টপকে আরো দূরের দিকে চেয়ে আছে যেন।

ছেলেটা বলে -
"আপনি আরেকটু পরে আসুন। মা এখনো স্কুল থেকে ফেরেনি। আপনি কি দরকারে এসেছেন একটু বলবেন তাহলে মা ফিরলে বলবো আপনার কথা।"

রাণী অবাক হয় কথাগুলো শুনে। তার এই বেশভূষা, প্রসাধন, হাতের ঢোলক এসব দেখেও এরকম প্রশ্ন কেউ করতে পারে !!

-"বলি চোখের কি মাতা খেয়েচো নাকি?" বলে রাণী।

-"সে তো জন্ম থেকেই খেয়েছি?" বলেই সামনের ছেলেটার হো হো করে হেসে ওঠে।

রাণীর মুখের কথা মুখেই থেকে যায়, ভাল করে লক্ষ্য করে দেখে ছেলেটি দৃষ্টিহীণ। ওই কারণেই চোখের দৃষ্টিটা ওরকম লাগছিল।

রাণী কোনোক্রমে বলে- "এই বাড়িতে কি বাচ্ছা হয়েছে ? ত্ তাই আমি এসেছিলাম আর কী!"
মুখের ভাষা আর গলার তীব্রতা নিজের অজান্তেই সংযত হয়ে যায় রাণীর। কোনো সময় সে ও যে ভদ্রভাবে মিষ্টি করে কথা বলতে জানত মনে পড়ে যায় হঠাৎই।

-" ও হো! না না সেটা দুটো বাড়ি পরে। তবে ওরা তো হসপিটাল থেকে সোজা বাচ্ছার মামারবাড়ি চলে গেছে। যাহ্ তুমি এই দুপুরে রোদে গরমে কষ্ট করে শুধু শুধুই এলে। একাই এসেছে তুমি?
এস, ভেতরে এসে একগ্লাস জল খেয়ে যাও।"

----------

রাণীর এই বাইশটা বসন্ত পার করে আসা জীবনে সেই ছোটোবেলায় বাবা মা ছাড়া এভাবে কেউ ওর সাথে ভালোমুখে কথা বলেনি। ইতস্তত করে রাণী ঘরের ভেতর পা রাখে। সামনের ডাইনিং টেবলের গা থেকে চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে ও।

ছেলেটি হাতের মাউথ অর্গ্যানে একটা সুর তুলতে তুলতে আরেক হাত দিয়ে দেওয়ালটায় হাত দিয়ে নিজের দিশা ঠিক করে এগিয়ে যায় ফ্রিজের দিকে।

ধীরে ধীর ঠান্ডা জলের বোতলটা নিয়ে, একটা কাঁচের গ্লাসে গড়িয়ে আবার দেওয়ালের সাহারা নিয়ে আসে ডাইনিং টেবিলের দিকে ছেলেটি। গ্লাসটা রাখে টেবিলে।

-"এই নাও জলটা।"

ঢক্ ঢক্ করে জলটা শেষ করে রাণী বলে
-"আচ্ছা তুমি কি যেন সুর তুলছিলে যন্ত্রটায়
'আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে...' তাই না? "

- "হ্যাঁ তো। তুমি জানো গানটা?"

-"ছোটোবেলায় প্রাইমারি স্কুল অব্দি পড়েছি। তখন স্কুলে প্রার্থনায় গাইতাম জানো। তারপর আর তো স্কুল যাওয়া হলনা।"

-"কেন স্কুল গেলেনা কেন আর?"

-"কোন স্কুলে যাব বল তো? বাবা ছেলেদের স্কুলে ভর্তি করাতে গেল, নিলনা। মেয়েদের স্কুলেও ‘না’ করে দিল। উল্টে সবাই হাসাহাসি করতে শুরু করল। আমি যে একূল ওকূল কোনও কূলেরই নই গো। কিছুদিন বাবা ঘরে মাষ্টার রেখে পড়িয়েছিল, গানও শিখিয়েছিল। তারপর যা হয়, আমার মত আরও কিছু মানুষের দল আমার বাড়িতে এল, আমার সন্ধানে। আমাদের মত না-মানুষদের ঠিকানা তো নির্দিষ্ট করাই থাকে।”

-“তোমার মা বাবা তোমায় নিজের কাছে রাখলেন না কেন?”

-“তাদের দোষ দিই না গো। আমি থাকলে পরে আমার আর বোনেদের বড় হয়ে বিয়ে থা হবে না। পরিবারের সবার সম্মান নষ্ট হবে। এর চেয়ে এই বন্দোবস্ত ঢের ভালো।
যাকগে, আমার কথা বাদ দাও। তুমি খুব ভালো বাজাও তো। আমার অনেকদিন পর গান গাইতে ইচ্ছে করছে।"


-"আমার মায়ের স্কুলে একটা বাৎসরিক অনুষ্ঠান হবে। দিন পনেরো পরেই। তার জন্যই একটু প্র্যাকটিস। অন্য কোথাও তো আমার মত মানুষকে ডাকে না। তুমি গাইবে? আমি তবে বাজাই।"

-"গাইব?"

-"গাও না, কে শুনছে? তোমার নামটা বললে না তো? আমি রাজা।"

-"আমার নাম রাণী।
হা হা! আমরা এমন রাজা রাণী যাদের ভাগ্য ভিখারীর মত।"

-"মোটেও না রাণী। জানো তো আমাদের কর্মই আমাদের পরিচয়, আমাদের অক্ষমতাগুলো নয়। তোমার স্বপ্নগুলো পূরণ করার মধ্যে দিয়েই তো তুমি আসল রাণী হবে। এবার গানটা ধরো দেখি।"

---------

মাউথ অর্গ্যানের তালে, ভাঙ্গা ভাঙ্গা অনভ্যস্ত গলায় সুর মেলায় রাণী। বারবার তাল কেটে যায়। হো হো করে হেসে ওঠে দুজনেই। হাসির মাঝে দুজনেই খেয়াল করেনা যে বাইরের দরজাটা চাবি দিয়ে খুলে রাজার প্রৌঢ়া বিধবা মা ঘরে এসেছেন।
রাণীকে চেয়ারে উপবিষ্ট দেখে এবং রাজাকে তার সামনে বসে হাসতে দেখে রাগে চীৎকার করে ওঠেন অনুরাধা দেবী,
-"কী হচ্ছে টা কী এখানে? রাজা তুই কাকে ঘরে ঢুকিয়েছিস? পাগল হয়েছিস তুই?"

এরকম অনেক অপমান শোনায় এবং তার উপযুক্ত উত্তর করায় যথেষ্ট অভ্যস্ত রাণী। কিন্তু আজ যেন অন্য জগতে চলে গেছিল রাণী। কোনো উত্তর না দিয়ে খোলা দরজাটা দিকের হাঁটা দেয়। রাজাকে বলে
-"চলি রাজা।"

অনুরাধা দেবীর সব রাগ গিয়ে পড়ে রাজার ওপর।
-"তোর মত ছেলের জন্ম দেওয়ার জন্য তোর বাবা আমায় ছেড়ে চলে গেছে। স্কুলের চাকরি করে যেটুকু সাচ্ছল্য সম্মান এসেছে সেটাও কেড়ে নিতে চাস?"
-"মা একজন শিক্ষিকা হয়ে এই কথা বলছ তুমি!! আমি পঙ্গু শারিরীক ভাবে, রাণী সামাজিক ভাবে। কিন্তু তোমরা তো সুস্থ হয়েও মানসিকভাবে পঙ্গু।"

ব্যথাতুর মুখ নিয়ে হতভম্ব অনুরাধা দেবীকে পাশ কাটিয়ে ধীরে ধীরে নিজের ঘরের দিকে চলে যায় রাজা।

---------

-"কী রে? কাল সারাদিন কথা বললি না। আজ এখনও অভিমান করে থাকবি রাজা? আমি স্কুলে যাচ্ছি কিন্তু"
বন্ধ দরজার ওপার থেকে কোনো সাড়া আসেনা। বেরিয়ে যান অনুরাধা দেবী।
সারা দিন একা ঘরে অস্থির হয়ে সময় কাটে রাজার। মাউথ অর্গ্যানটা তুলতে ইচ্ছে করেনা। এমন সময় দরজায় টোকা মারার আওয়াজ কানে আসে। নিজের অজান্তেই এক চিলতে হাসি খেলে যায় ওর মুখে। দরজাটা খুলে বলে
-"এসো রাণী!"
চৌকাঠের ওপারে দাঁড়িয়ে রাণী। আজ একটা সালোয়ার কামিজ পরা। প্রসাধনবিহীন নিরাভরন। সাধারণ এক তরুণীর মতই লাগছে ওকে। যদিও রাজার কাছে সেটা অধরাই।
-"তুমি কী করে জানলে এটা আমিই?"
-"সব কিছুর জন্য চোখ লাগে না রাণী। আমি জানতাম তুমি আসবে।"

মাউথ অর্গ্যান তুলে নেয় রাজা, সুর মেলায় রাণী। সুরের মূর্চ্ছণায় গাল বেয়ে জল গড়ায় দুজনের। রাণী হাতটা বাড়িয়ে চোখের জলটা মোছায় রাজার। ওর দৃষ্টিহীণ চোখদুটোয় হাত বোলায়।

-রাণী তোমার হাতের ছোঁয়া ঠিক আমার মায়ের মত। এ তো একটা নারীর স্পর্শ রাণী।"
নিজের হাতটা আন্দাজে বাড়িয়ে রাণীর মুখটা স্পর্শ করে রাজা।

-"রাজা জানো আমার মেয়ে হওয়ার বড় ইচ্ছে। আমিও চাই আমার পোশাকে রক্তের ছাপ লাগুক। কোনো পুরুষ ভালোবেসে কাছে টেনে নিক। মাতৃত্বের স্বাদ পেতে আমারও বড় মন চায়।
তবে সবকিছুর আগে কি চাই জানো?
অধিকার। অতিরিক্ত সুযোগ সুবিধা নয়, সমান অধিকার। একটা স্কুল গড়তে চাই যেখানে তৃতীয় লিঙ্গ হওয়ার 'অপরাধে' কোনো পড়ুয়া কে ফেরানো হবেনা। বাসে ট্রেনে কেউ করুণা বা ঘৃণার দৃষ্টি নিয়ে তাকাবে না। তাই তো সব অপমান সয়ে তিলে তিলে সঞ্চয় করছি।"

হাতড়ে হাতড়ে রাণীর হাতটা নিজের হাতে নেয় রাজা।
-"হবে রাণী হবে। সেই দিনটা আসবে।"

রাণী হেসে বলে
-"আজ চলি রাজা। তোমার মা এসে যাবেন। কাল আসব। জানিনা কেন বারবার ফিরে আসতে ইচ্ছে করে তোমার কাছে।"

---------

কয়েক দিন এভাবেই কাটে। গানের অনুশীলনের সাথে সাথে স্বপ্ন বোনা চলতে থাকে। দুটো তথাকথিত অসম্পূর্ণ মানুষ গেঁথে চলে স্বপ্নের মালা।
আর ক'দিন পরেই অনুষ্ঠান।
অনুরাধা দেবী আজ একটু তাড়াতাড়িই বাড়ি ফিরেছেন।

দরজাটা খুলতেই কানে ভেসে আসে গানের সুর তার সাথে চেনা মাউথ অর্গ্যানের শব্দ।
"আগুনের পরশমণি..."
পায়ে পায়ে রাজার ঘরের দিকে গিয়ে দেখেন সালোয়ার পরা এক তরুণী পেছন ফিরে খাটে বসে গাইছে। রাজা দু’চোখ বুজে অর্গ্যানটায় বুক খালি করে ফুঁ দিচ্ছে। চোখের কোনে শ্রাবনের ধারা।
ওঁর পায়ের শব্দে চমকে পেছন ফেরে মেয়েটি, গান থেমে যায়। অবাক হয়ে বলেন অনুরাধা
-"তুমি সেই মেয়েটা মানে ইয়ে মানে ..."
-"আমি সেই মানুষটাই বটে মাসীমা।"

অনুরাধা দেবীর বুকটা রাজার ভয় আর যন্ত্রণামিশ্রিত মুখটার দিকে চেয়ে মোচড় দিয়ে ওঠে। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে দুজনের মাথায় হাত রাখেন তিনি।
বলেন,
-"আমার এই দৃষ্টিহীন ছেলে তার অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে যা দেখেছে। আমি চোখওয়ালা মানুষ হয়ে তা দেখিনি। এক নারী হয়ে আরেক নারীর হৃদয় কে চিনিতে পারিনি। শুধু বাহ্যিকটা দিয়েই বিচার করেছি। ধিক্ আমার নারীত্ব, মাতৃত্ব।
তবে আর নয়। তোরা জমিয়ে গান প্র্যাকটিস কর তো।
শোনরে মেয়ে, আমার রাজার সাথে অনুষ্ঠানে তুইও গান গাইবি। আর হ্যাঁ গানের চর্চাটা যেন না থামে। সামনের মাসে আমাদের স্কুলের মিউজিক টিচারের পদটা খালি হতে চলেছে। ভাবছি তোর কথা বলব বড়দির কাছে।
তোরা বোস। আমি সবার জন্য একটু চা নিয়ে আসি। জমিয়ে তোদের গান শুনবো তারপর।"

Susmita Kundu

Susmita Kundu has a Ph.D in Physics from the Saha Institute of Nuclear Physics in Kolkata. She loves to read children's literature and write for children.


The beliefs, views and opinions expressed in this article are those of the author and do not necessarily reflect the opinions, beliefs and viewpoints of Soi or official policies of Soi.