আমরা কি সত্যিই খুব ভালো আছি? জিজ্ঞেস করলে প্রশ্নের উত্তরটা অবশ্য অবধারিতভাবেই হ্যাঁ হয়, কারণ হ্যাঁ বললেই আরও অনেক প্রশ্নের হাত থেকে রেহাই মেলে আর কিছু প্রশ্নের থেকে আমরা গা বাঁচিয়েই চলতে চাই। তাছাড়া যতক্ষণ না আমার নিজের ঘরে আগুন লাগছে, ততক্ষণ আমার কি? আমার পাশের বাড়ি পুড়ছে পুড়ুক, আমি লাইক, কমেন্টের গণ্ডীতেই নিজেকে আটকে রাখি। কিন্তু যে সমাজের ছেলেমেয়েরা ব্লু হোয়েলের মতো সর্বনাশা খেলায় আসক্ত হয়, খেলার টাস্ক কমপ্লিট করতে নিজের জীবনে দাঁড়ি টানতেও পিছ পা হয় না, সে সমাজে মানুষ ভালো থাকে কী করে?

ব্লু হোয়েলের কথা যখন প্রথম শুনেছিলাম, চমকে উঠেছিলাম। এ কী খেলা! খেলা না জীবন নিয়ে ছেলেখেলা! আরও আশ্চর্য হয়েছি এটা ভেবে যে টাস্কের নামে যাই দেওয়া হোক না কেন খেলুড়েরা তা মুখ বুজে নির্বিবাদে মেনে নেয়! অক্ষরে অক্ষরে পালন করে! তা সে নিজের হাতে ধারালো কিছু দিয়ে নীল তিমির ছবি আঁকাই হোক বা ছাদ থেকে ঝাঁপ দেওয়াই হোক! আশ্চর্য, তাই না? আশ্চর্য হলেও সত্যি। এই মেনে নেওয়ার পেছনের কারণ বোধহয় অনেক গভীরে। আমরা খেয়ালও করি না বা বলা ভালো খেয়াল করতেও চাই না আজকাল স্কুল, কলেজ পড়ুয়ারাও কী অসম্ভব অবসাদে ভোগে। ছুটতে ছুটতে তারা ক্লান্ত। হ্যাঁ ছোটাই তো, ছোটা ছাড়া আর কী বলা যায়? আরও নম্বর, আরও ভালো রেজাল্ট, আরও ভালো স্কুল, কলেজে চান্স পাওয়া – আরও, আরও আরও! এই আরও-র পেছনে ছুটতে গিয়ে হারিয়ে গেছে তাদের বিকেল, হারিয়ে গেছে বিকেলে মাঠে খেলাধুলো। সে সময়েও তো পিঠে একটা ভারি ব্যাগ নিয়ে যেতে হয় পড়তে। বাবা, মারই বা সময় কোথায়? তাঁরাও তো ছুটছেন ওই আরও-র পেছনেই। আরও-র সংজ্ঞাটা শুধু পালটে যায় অবস্থাভেদে, বয়সভেদে। ফলে ছোটোরা আজকাল ‘ওয়াইল্ড অ্যানিম্যাল’ চেনে স্মার্ট ফোনের স্ক্রিনে, গান দেখেও ওই একই স্ক্রিনে। তাছাড়া নিন্দুকরা যাই বলুক, এ যন্তরটার কম উপকারিতা নাকি! বাচ্ছা খাচ্ছে না, ওতেই কিছু একটা চালিয়ে দাও, তাড়াতাড়ি খেয়ে নেবে, বড়োরা গল্প করছেন, বাচ্ছা ঘ্যানঘ্যান করছে, ওইটা হাতে দাও, বাচ্ছা নিমেষে চুপ। ছোটো থেকেই তো আজকাল সবাই স্মার্ট ফোন ব্যবহারে অভ্যস্ত। আর এই করতে করতেই নিজের অজান্তেই কখন যেন ফাঁদে আটকে পড়া। বড়োরাই বা কম কীসে? কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ না দেখলে কি তাঁদেরও চলে? একই ঘরে বাবা, মা আর তাদের সন্তান বসে রয়েছে, অথচ তিনজন নিজেদের মধ্যে কোনও কথা বলছে না, ব্যস্ত নিজেদের স্মার্ট ফোন নিয়ে – এ দৃশ্য আজকাল দুর্লভ তো নয়ই, বরং ঘরে ঘরে। ফল নিজেদের মধ্যে দূরত্ব বৃদ্ধি পাওয়া। তার ওপর তো আছে ওই সর্বনেশে আরও-র চাপ! অবসাদের আর দোষ কী? কোনও না কোনও না কোনও সময় সে তো গ্রাস করবেই আমাদের। পরিস্থিতি এমনই পর্যায়ে গেছে যে পরীক্ষা পেছোতে এক স্কুল পড়ুয়া নির্দ্বিধায় শেষ করে দেয় আরেক পড়ুয়ার জীবন!

তবু আমরা বলি আমরা ভালো আছি, ততক্ষণ বলি যতক্ষণ না আমার নিজের হাত পুড়ছে। বলি না, না আমরা ভালো নেই, বলি না আরও দেরি হয়ে যাওয়ার আগে এবার ভাবা দরকার, কিছু করা দরকার। কিন্তু সত্যিই কি বলব না? কোনওদিন না? এর উত্তরও আমাদেরই দিতে হবে, সর্বনাশের হাত থেকে ছোটোদের ফিরিয়ে আনতে হবে। বিশ্বাস রাখি কেউ না কেউ এগোবেনই, হয়তো ইতিমধ্যেই এগিয়েছেন, হয়তো এখন সংখ্যাটা নগণ্য, কিন্তু একজন দুজন করেই তো অনেকজন হয়।

Aditi Bhattacharya

Aditi Bhattacharya studied Statistics; likes reading, writing, embroidery, travelling, photography; writes both for young and adult readers. Her stories have been published in several printed and online magazines and papers.


The beliefs, views and opinions expressed in this article are those of the author and do not necessarily reflect the opinions, beliefs and viewpoints of Soi or official policies of Soi.