মা'র কাশিটা ঠাণ্ডার মুখে বড্ড বেড়ে গেছে। বাবা সেই যে জ্বর নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেল, জানি না আবার কবে সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরবে। তবুও সব্জি-আনাজ বিক্রি করে মহাজনের ঘরে কিছু দিয়ে রোজের ভাত-ডালের ব্যবস্থাটা হত, কিন্তু ক'দিন থেকে তা-ও বন্ধ। আর এখনকার কী জ্বর – কবে সারবে তা কেউ বলতে পারবে না। এত কষ্ট করে, এত আশা নিয়ে আমাকে লেখাপড়া শেখাল, এখন তো আমার মুখ চেয়েই ওরা থাকবে। কিন্তু এই গঞ্জ শহরে বেশি দামের টিউশনও পাওয়া যায় না, সব কোচিং ক্লাসে যায় ছাত্রেরা কম পয়সায়। আমাদের এই দেড়খানা ঘরে টিউশন ক্লাস খোলবারও কোনো উপায় নেই। ছাত্রছাত্রীদের বসতে দেবো কোথায়। কত চেষ্টা তো করছি যেমন-তেমন একটা চাকরি, মাস-মাইনে – একটু আশা – একটু আলোর মুখ দেখার।

খবরের কাগজের এই বিজ্ঞাপনটা আবার কেমন বুকের ভেতর কীসের যেন হাতছানি দিল। যে চাকরিই হোক – সরকারি কাজ তো, আমার এখন চাকরি দরকার – একটা কাজ। দিনের পর দিন আর এভাবে চলতে দেওয়া যায় না।

খুব ভালো করে অ্যাপ্লিকেশন করলাম। বাক্সে যত্ন করে গুছিয়ে রাখা সার্টিফিকেটগুলো আবার জেরক্স করালাম। আমি খুব ভালো স্টুডেন্ট ছিলাম। তাই স্কুলজীবন থেকেই মাস্টারমশাইরা পছন্দ করতেন। কলেজের পর ইউনিভার্সিটি –সবই ওঁদের সাহায্যে আর নিজের টিউশনের টাকায় পড়াশোনা কমপ্লিট করেছি শুধু একটা ভালো চাকরি আর একটু সুদিনের আশায়। প্রফেসররা উদ্যোগ নিয়ে পিএইচডি করার ব্যবস্থাও করে দিলেন। সেই স্কলারশিপের টাকায় বেশ ক'বছর সংসারে হাসি জুগিয়েছিলাম – কিন্তু এখন তো সবই শেষ। এবার তো আমার নিজেকে কিছু করতে হয়। বড় ধিক্কার লাগে নিজের জীবনের প্রতি। ভালো লাগার সাবজেক্ট যে পেটের অন্ন জোগাতে পারে না – সে কথা সেদিন কেন বুঝিনি। কেন বুঝিনি বৈষ্ণব পদাবলি নিয়ে গবেষণাপত্রগুলো নম্বর দেয় – চাকরি দেয় না। স্কুল-কলেজগুলোতে আমার মতো মুরুব্বি-হীন ছেলের যে কাজ হয় না সে তো নিজের জীবন দিয়েই বুঝছি।

যাই হোক কাগজে লেখা ছিল সরাসরি দেখা করার কথা। গুণাগুণ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাক্রম। যাক সেগুলো পেরিয়ে আরও কিছুদূর এগিয়েছি অবশ্য। তবে কাজটা কী সেটাও লেখা ছিল বিজ্ঞাপনে। সরকারি হাসপাতালের মর্গে 'ডোম'-এর দরকার।

মনটা বলল কতজন তো এম.এ. পাশ করে ক্লাস ফোর স্টাফও হয়। আমার এই নিদারুন সময়ে কি এ-কাজ আমি পারব না – তবু তো সরকারি কাজ। পারতেই হবে আমাকে।
সময়মত ডাক এল। লক্ষ লক্ষ প্রার্থী বোধহয়। লক্ষ না হলেও সহস্র তো হবেই। সকাল ন'টার পর থেকে অপেক্ষা করার পর বেলা তিনটে নাগাদ ডাক পড়ল। সার্টিফিকেট আর অ্যাপ্লিকেশন বার করে আশার দুরুদুরু বুকে ঢুকলাম ইন্টার্ভিউ-ঘরে। ঠাণ্ডা ঘর। একটু আরাম। টেবিলের ওপারে বসে আছে চার ব্যক্তি। তিনজনের পরনে হাতকাটা প্রায় ময়লা গেঞ্জি, হাফপ্যান্ট আর মাথায় রুমালের থেকে বড় একটুকরো কাপড় দিয়ে বাঁধা ফেট্টি। অন্যজন প্যান্ট-শার্ট পরা খুব সাধারণ এক ভদ্রলোক।
অ্যাপ্লিকেশন ও সার্টিফিকেটগুলো এগিয়ে দিলাম।
বললাম – নমস্কার।
- বসুন।
ফেট্টি-বাঁধা পরীক্ষক কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখে প্রশ্ন করল – কাগজ তো অনেক এনেছ, মর্গ নিজের চোখে দেখেছ কোনোদিন?
ঘাবড়ে গিয়ে বুঝলাম এটাই ইন্টার্ভিউ।
বললাম – আজ্ঞে না, নিজের চোখে দেখিনি তবে আইডিয়া আছে।
অন্য ফেট্টি প্রশ্ন করল – কীরকম আইডিয়া? মর্গের লাশ কেমন হয় জানো?
মনে হলোজীবনানন্দ দাশের কবিতার লাইন কটা বলে দিই।
অপর এক ফেট্টির প্রশ্ন –পেট চেরার পর কোন্ সুতো দিয়ে লাশের পেট সেলাই করা হয়?
আরও প্রশ্ন – সাতদিনের পচা মড়াকে কী করবে? কীভাবে বুঝবে সে কেমন করে মরেছে?
প্যান্ট-শার্ট পরা ভদ্রলোকটি বলল – আসলে সরকারি জায়গায় এসব কাজই ডোমেদের করতে হয়। ফরেনসিক ডাক্তাররা সেরকম কেস হলে দেখাশোনা করেন।
প্রথম ফেট্টি প্রশ্ন করে – আচ্ছা বল তো ছ'ফুট দু'ইঞ্চি একটা লোক যখন কুড়ি তলা বাড়ির ছাদ থেকে ঝাঁপ দেয় তখন তার চেহারাটা কেমন হয়ে যায়? জানো কি?
- আজ্ঞে মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যায়।
- আরে এ তো বাচ্চা ছেলেও বলতে পারে – জানো কি তার লম্বা-লম্বা পা'দুটো পেটের ভেতর ঢুকে যায় - ! ছ'ফুট হয়ে যায় তিন ফুট – সে-দৃশ্যকে তোমাদের ঐ কাগজ-জমানো লোকেরা বলবে বীভৎস। শোনো এ চাকরিটা 'ডোম' নেবার জন্য। 'ডোম' বোঝো? এখনও কোনো শ্মশানে মড়া পোড়াবার সময় যারা বাঁশের বাড়িতে চিতার আগুনে ফেলে মড়ার মাথা ফাটিয়ে দেয় – তারা হলো ডোম।
প্যান্ট-শার্ট পরা লোকটি বললে – দেখো বাপু, যা দেখলাম এতক্ষণ – আমার যতটুকু জ্ঞান আছে তাতে বুঝলাম তোমার পিএইচডি-র সাবজেক্ট ছিল 'বৈষ্ণব পদাবলি'। ঐসব পড়াতে তো মড়া ঘাঁটা যায় না। অত লেখাপড়ারও দরকার হয় না।
কাগজগুলো আবার আমার হাতে ফেরত দিয়ে দিল।
একজন ফেট্টি বলল – হুঃ,কী দিন এল – হাতে এত কাগজ নিয়ে এসেছে ডোমের কাজ করতে।
ঠাণ্ডা ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। মড়া-ঘাঁটা সার্টিফিকেটগুলো হাতে নিয়ে।
বাইরে কী অসম্ভব রোদের তেজ তখনও। আমার এত অন্ধকার লাগছে কেন – সব বড় অন্ধকার।
মনে হলো মায়ের কাশির আওয়াজটা যেন শুনতে পাচ্ছি।

Shubhra Mukhopadhyay

Shubhra Mukherjee is associated with different non-government organisations and literary groups. She loves to enact in audio plays and write, and is interested in literary pursuits in local dialects. She has a published collection of stories titled 'Hriday Bakhan'.


The beliefs, views and opinions expressed in this article are those of the author and do not necessarily reflect the opinions, beliefs and viewpoints of Soi or official policies of Soi.