জানেন আমি আসলে একটা মানুষ।নাড়াবার লেজ নেই,উড়বার পাখা নেই, মাথার চারপাশে ছটা অর্থাৎ জ্যোতি বার হয় না , জিভে আর মননে একটাই ভাষা আছে।মানে মানুষ শুধু নয় খুব ছোট্ট কিংবা বলা যায় বৈশিষ্ট্যহীন মানুষ।আসলে জনি লিভারের ডেসক্রিপশনের মতো। চোরটা কেমন দেখতে বললে, জনি লিভার জানাচ্ছে, "উস্কে দো হাত, দো টাং , দো কান , দো আঁখে,অর এক নাখ হ্যাঁয়। একদম আদমি কি মাফিক দেখনে মে।" ঠিক এই রকম।এই রকম একটা মানুষের আবার অনেক কথা জমে যায় বুকের মধ্যে,কলমের মধ্যে।তাই লিখি।

আমার মগজটা প্রকৃতিগত ভাবে একটু অগোছালো। মানে গুছিয়ে নিয়ে ভাবা বা কাজ কোনটাই ঠিক করে উঠতে পারি না। গুছিয়ে বন্ধুত্ব করতে পারিনা।এটার জন্যে " আমার কিছু আর হল না"।

কিন্তু সব কিছুরই একটা ইতিবাচক দিক আছে। অগোছালো হবার দরুন হেরে যাওয়াটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছে।" জিততে পারবো না" এটার ভয় নেই। মানে একটাই অপ্‌শন। তাই নো প্রত্যাশা, নো কান্নাকাটি।

আমার মা আর বাবা একটু পুরাতন জার্মান গাড়ি। কিন্তু আমি হাল্কা ফুল্কা টোটো। তাঁরা নিজেরা প্রচুর সৎ উপদেশ আর আচরণ দিয়ে আমাকে তৈরি করার প্রবল চেষ্টা করলেন। আমাকে যে হোস্টেলে রেখেছিলেন সেটি গেরুয়া রঙের । পনেরো বছরে শাড়ি পড়ে আমি সেটাতে জীবন চিনতে শিখি। খুব নিয়ম কানুন যেটা মানতে গিয়ে আমি সারাক্ষণ নিজে কতটা অযোগ্য সেটা বুঝতাম। না রেজাল্ট ভালো হত না আমার। কেবল লাইব্রেরিটা আমি নিজের করে ফেলেছিলাম। আর ইংরেজি । ওটা আমি জানি না। এটা আগে খুব লজ্জা দিত জানেন। আমি জানি সেলিম আলি বিরাট পক্ষীবিজ্ঞানী। কিন্তু ফুরফুর করে ইংরেজি জানা আমার বয়সী মেয়েরা বলে দিত 'অরনিথোলজিস্ট'। আমার বাংলা শব্দে জানাটা ইংরেজির কাছে দুমড়ে মুচড়ে যেত।আমার মফস্বলের মনটা ঠিক পরিনত নয়। সে দাঁড়াতে পারলো না। আমি দুটো বীভৎস মহাযুদ্ধ নিয়ে লেখা বেশ কিছু বড় মানুষের লেখা পড়লাম। না না পরীক্ষায় সেই সব নিয়ে কোন প্রশ্ন আসেনি। আমি লিখতে পেলাম কই। একা কুম্ভ বল্লাল সেন পড়ছে। একা কুম্ভ বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পড়ছে। একা কুম্ভ মায়াকোভস্কি পড়ছে। একা একা কুম্ভ সঞ্জীব , নৃসিংহ প্রসাদ,মহাশ্বেতা দেবী, সমারসেট মমের অনুবাদ পড়ছে । ওইটাই হল আর কিছু হল না।
সত্যি কিছু হল না। মা হওয়া ছাড়া। আমি বাংলা নিয়ে, অনেক শব্দ নিয়ে, অনেক সাধারন মানুষের জীবনের কথা নিয়ে চুপ করে বসে থাকলাম।

ওই টানাপোড়েনের বয়ঃসন্ধি কেটে যাবার পর আমার অগোছালো মাথাটা একটু ফাঁকা হয়ে গেল। যত মন খারাপ হেরে যাওয়া সব ঝাঁট দিয়ে পেছন দরজা দিয়ে বার করলাম। ফেসবুক বলে একটা ব্যাপার এলো। তারপর " আমি লিখি"। আমি যে অঞ্চলে ছিলাম, নদীর ধারের সেই মফস্বল শহর্‌ গ্ল্যামারহীন নিপাট সাধারন সেই জীবনটি বড্ড মায়াময়। সেখান কার ফেকনির মা, সাগর মাঝি, মালাদিদি , মানিক সত্য পীরের নামে গান গাওয়া সুফি ভিখারি সব্বার জন্যে অনেক অনেক মন খারাপ থাকে। কলকাতায় ওরকম দামী মানুষদের পাওয়া যায় না।তবে অনেকে বলেন এখানেও নাকি আর ওরকম দামী মানুষরা থাকেন না। আমি কাজের মেয়েদের অনেক কষ্ট, আনন্দ, আর সংগ্রাম দেখতে পাই। রিক্সাওয়ালা, আয়া মাসী, মুচি, নোংরা নিতে আসা ছেলেটির অপূর্ব জীবন যাপন দেখে অবাক হই। পাঁচ বাড়ি কাজ করা মাসী যখন পাঁচটা বাড়ির থেকে পাওয়া পাঁচটা শাড়ি থেকে দুটো শাড়ি রেখে দেয় স্বামী পরিতক্ত্যা ননদের জন্যে ,তখন একটু অন্য আলো পড়ে মনের অন্ধকারে। ময়লা নেওয়া ছেলেটি তার বাংলাদেশে থাকা মা'র শরীর খারাপের কথা বলতে গিয়ে চোখে জল ফেলে তখন একটু কষ্ট পাওয়া কে আমি ভালোবাসি। আমি প্রথম যখন শপিং মলে যাই, চোখে ধাঁধা লেগে গিয়েছিল। সাহেব সাহেব ব্যাপার। আজকাল কিন্তু আর ভালো লাগে না। শপিং মলের আবহাওয়াতে দুটো বোধ তীব্র হয়। একনম্বর- এতো ভোগের জিনিস আদৌ দরকার? দু নম্বর- আমার এগুলো নেই। ঠিক এইখানে আমার বাবা খুব শান্ত ভাবে পাশে থাকেন। বলে দিয়েছেন, "হিসেব কর... তোমার কী কী আছে"। হিসেবটা খুব আনন্দের।আমার সব আছে। আমি দেখতে পাই, শুনতে পাই, চলতে পারি, হাসতে পারি, বলতে পারি আর অবশ্যই আমি লিখতে পারি। আমার এতো অনন্য ব্যথা জানা আছে। এক বাড়ি মানুষের মধ্যে কী ভয়াবহ পরিমাণ একা হয়ে যাওয়া থাকতে পারে তার তীব্র অভিজ্ঞতা আছে। ওটা নিয়েই আছি।

পরিবারের মধ্যেও একটা ইস্কুল থাকে। আমি সেখানে সব থেকে পেছনের বেঞ্চে বসে থেকেছি। আর এখন অবশ্য আর পেছনেও বসি না। ক্লাস চলছে।উৎসব চলছে। আমি চুপ করে মাঠে নেমে গেছি। প্রচুর আলো আর অনেক অনেক গাছপালার মধ্যে।আর সেখানে অনেকে লেখে। নিজের কথা । অন্যের কথা। তাদেরকে কোন শব্দ ছাড়াই ছুঁয়ে থাকি। ছুঁয়ে থাকবো। আর লিখে যাবো।

Nivedita Ghosh Marjit

Nivedita Ghosh Marjit is a young writer, who handles her ladle and pen simultaneously with equal elan.


The beliefs, views and opinions expressed in this article are those of the author and do not necessarily reflect the opinions, beliefs and viewpoints of Soi or official policies of Soi.