'Silence Like a Cancer Grows -এ নৈঃশব্দ্য আত্মঘাতী' সিরিজে নবনীতা দেব সেনের ব্যক্তিগত গদ্য

কিছুই ভালো লাগে না।এই তো আমার পৃথিবী। এই তো আমার দেশ।এই তো আমার রাজ্য। এই তো আমি। বলো তো দেখি, এরকম দেশকে তোমার আপন বলতে আর ইচ্ছে করে? এত হানাহানি ,এত হিংসা, এত অমানবিকতা, এত অ-ভালোবাসা, এত অবুঝপনা!নিজের ভালো কীসে, সেটা নিজে না বুঝলে একটা বয়সের পরে কি আর অন্যে পরে বুঝিয়ে দিতে পারে? গোটা একটা জাতি যদি মেতে ওঠে আত্মহানির নেশায়, নিজেরা নিজেদের না বাঁচালে কে বাঁচাবে আমাদের?

প্রতিটি তৃণ এখন মুষলের আকার ধারণ করছে, প্রতিবেশীকে আঘাত করার জন্যে। আমাদের মন কোথায়? বুদ্ধি কোথায়? স্মৃতি কোথায়? আমাদের বংশরক্ষার প্রবৃত্তিও কি রাজলক্ষ্মীর রাজ্যত্যাগের মতো আমাদের ত্যাগ করে গিয়েছে ? নিজেদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই কি এখন আমাদের একটু পরের প্রজন্মের দিকে তাকানো উচিৎ নয়? আমাদের দেখে ওরা কী শিখছে ? কী দিয়ে যাচ্ছি আমরা ওদের ?

দিয়ে যাচ্ছি অপ্রেম।

দিয়ে যাচ্ছি অবিশ্বাস।

মমত্বহীনতা। দায়িত্বহীনতা। হাতে তুলে দিয়ে যাচ্ছি ঘৃণা। সন্দেহ। তাৎক্ষণিক সুখের লোভ। পায়ের তলা থেকে কেড়ে নিচ্ছি পারষ্পরিক নির্ভরতার মাটি।

আত্মচেতনার নামে আমাদের সন্তানদের আত্মসর্বস্ব, প্রকৃত অর্থে আত্মছাড়া করে তুলছিআমরা। বর্তমানের ক্ষুদ্র স্বার্থ থেকে নিজেকে একটু সরিয়ে নিয়ে আমরা পরের প্রজন্মে স্বার্থের দিকে তাকাব আর কবে ?

নিজেদের ভালো আর অন্যের মন্দকে এক করে দেখার মতো বিপরীত বুদ্ধি আমাদের ঘুচবে কবে ?

মন ভাল নেই, মনভাল নেই,মন ভাল নেই, একটুও ভাল নেই মন।

সংবাদপত্র মানেই দুঃসংবাদের পত্র। মানবিকতার যত রকমের অবমাননা সম্ভব, সব কিছুরই উজ্জল দৃষ্টান্তআমাদের প্রাত্যহিক সংবাদপত্রগুলো। প্রকাশ না করেও তো উপায় নেই।মানুষ কুকুরকে কামরালে খবর হয়, এতো আবাল্য শুনেছি। এখন অবাক চোখে দেখি, মানুষ যত্রতত্র কুকুরকে কমড়ে দিচ্ছে। সব ভাষাতেই, সব গোষ্ঠীতেই একই সমস্যা। মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির চেয়ে অপ্রীতির সঞ্চারেই বেশি কার্যকরী হয় এসবঅমানবিকতার সংবাদ। আমরা মেয়েরা তো যথেষ্টই অরক্ষিত বোধ করছি, সমাজ ও শাসনব্যবস্থার কাছে আমাদের ভরসা কই ? ব্যক্তিও অরক্ষিত বোধ করছে, সমস্যাটিও অরক্ষিত বোধ করছে। তাহলে নিশ্চিন্ত কে?

এই মনের ভাব থেকেই সমাজের পায়ের তলার মাটিতে কাঁপন ধরে। আজকের দিনের আমাদের কথা ভেবেই স্বামী বিবেকানন্দনভেম্বর ১৮৯৩-তে মার্কিন দেশে হিন্দুধর্ম বিষয়ে তাঁর একটি বক্তৃতায় বলেছিলেন,“আমাদের দেশে দু’টি শব্দ আছে, যাহার অর্থ এদেশ(আমেরিকায়) সম্পূর্নই আলাদা। শব্দ দু”টি হইল, ‘ধর্ম’ এবং ‘সম্প্রদায়’। আমাদের মতে ধর্মগুলো ধর্মমতের মধ্যেই অনুস্যুত।আমরা পরমত-অসহিষ্ণুতা ছাড়া আর সব কিছুই সহ্য করি।অপর শব্দটি, ‘সম্প্রদায়’, তাহার অর্থ একটি সমমত-সমর্থক সখ্যবদ্ধ ব্যক্তির দল, যাহারা নিজদিগকে ধার্মিকতার আবরণে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়াইয়া বলিতে থাকেন – ‘আমাদের মতই ঠিক, তোমরা ভুলপথে চলিতেছ’। ইহার প্রসঙ্গে আমার দুই ব্যাঙেরগল্পটি মনে পড়িল”।

এখানে তিনি কূপমন্ডূকের কাহিনীটির উদাহরণ দিয়েছেন। কিন্তু ১৮৯৩ আর ২০১৭-তে অনেক তফাৎ।আমরা আরও পিছিয়ে গিয়েছি। কুয়োটা ক্রমশ আরও সরু হয়ে যাচ্ছে। এখন অলীক সব।

পরের বছর ১৮৯৪-এর জানুয়ারি মাসে স্বামীজি আমেরিকার মেমফিসে একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন, খবরের কাগজে রিপোর্টে সেটিকে বর্ণনা করা হয়েছিল ‘পরমত সহিষ্ণুতার জন্যে অনুনয়’ বলে। রিপোর্টার লিখছেন – “এই ভাষণটিকে যথার্থই বিশ্বজনীন পরধর্ম-সহিষ্ণুতার সপক্ষে একটি অনুনয় বলা যাইতে পারে। ...স্বামীজি বলেন - ‘পরমত সহিষ্ণুতা এবং প্রেমই হইল প্রধান প্রধান ধর্মের মূল উদ্দীপনা’। তাঁহার মতে ‘ইহাই যে কোনো ধর্মবিশ্বাসের শেষ লক্ষ্য হওয়া উচিত”।

পরমত সহিষ্ণুতা এবং প্রেম -বিবেকানন্দ এই দু’টি লক্ষ্য বেঁধে দিয়েছিলেন ধর্মের জন্য। আমরা তার কোনোটারই স্বাদ জানি না আর।

১৮৯৩,১৮৯৪ থেকে ২০১৭।জীবনের এই দিক দিয়ে আমরা অগ্রসর হইনি, পশ্চাৎপরই হয়েছি। জানি না কীভাবে প্রতিবাদ করলে কোনও কাজ হবে। আমাদের প্রতিবাদে কান দেওয়ার মতো কর্ণধার কোথাও আছেন কি,তাহলে অনুগ্রহ করে কান দিন, শুনুন। আমরা তো বৃটিশ রাজত্বের সময় জন্মেছি, সত্যি বলতে কী, ছেচল্লিশে ডিরেক্ট অ্যাকশানের পরে ধর্মীয় অশান্তিকে ঠিক এইভাবে বিষাক্ত ফণা তুলতে দেখিনি পশ্চিমবঙ্গে। বিরানব্বইয়ের অশান্তি ছিল দেশজোড়া। তুলনায় বংলার অবস্থা তখন শান্ত।

এখন আমাদের অবস্থা সঙ্গিন, কেননা ঘৃণা এখন সবটাই ভেতরে ভেতরে। গরিব,বঞ্চিত,অসুখী মানুষের চিত্তবৃত্তিতে রক্তের আমিষ স্বাদ লেগে গিয়েছে। তাতে নিজেরাই অসুস্থ হয়ে পড়ব, সেই ধারণাটি নেই। ধনী মানুষের তো এখনও তেমন গায়ে লাগছে না এই দাঙ্গার ঝাপটা। পরে টের পাবেন।

-          এই ছোঁয়াচে রোগের নিরাময় চাই। অচিরেই। কোথায় আছে বৈদ্য ? সাড়া দাও।

-          সবাই মিলে সচেতন হয়ে জোরালো প্রতিবাদ না জানালে...

-          আমাদের রাগ, ক্ষোভ, উদ্বেগ বেদনা প্রকাশ না করলে...

-          এই অদূরদর্শিতার বিভ্রম সংশোধনের অক্লান্ত চেষ্টা না করে চললে...

-          বারবার একই ভয়ের কথা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে না বলে চললে...

-          না বলে চললে...না বলে চললে...

-          আর কি আমরা আমাদের বিপন্ন ভবিষ্যৎকে সুস্থ-সবল,উঁচু মাথা করে তুলতে পারব?

 

(পুনঃপ্রকাশিত। 'ব্লগব্লগম'-এর জন্য সামান্য পরিমার্জিত)

 

Nabaneeta Dev Sen

Nabaneeta Dev Sen is one of the best-known contemporary Bengali authors and a leading professor and scholar of Comparative Literature. She has received many honours including the Padma Shree and the National Sahitya Akademi Award. She is the founder President of Soi, Women Writers’ Association and the President of P.E.N India, West Bengal Chapter.

More posts by the author

The beliefs, views and opinions expressed in this article are those of the author and do not necessarily reflect the opinions, beliefs and viewpoints of Soi or official policies of Soi.