দেশে ফিরে এসে মন কোথায় পুলকিত থাকবে তা নয় লজ্জায় ঘেন্নায় ধুলোয় লুটিয়ে পড়েছে। এ আমার কোন ভারতবর্ষ ? অনেকদিন বাইরে থাকার ফলে জড়ো হওয়া নানান ব্যস্ততায় আমি টেলিভিশন খুলে খবরের বিতর্ক দেখার সময় পাইনি, সত্যি বলতে কি ভেতর থেকে উৎসাহও পাইনি, খবরের কাগজগুলোই যথেষ্ট মাথা বিগড়ে দিয়েছে।
এই কি আমার এত গর্বের ভারতবর্ষ ? দূরের পাড়িতে আকাশে উড়লেই মন উথাল পাথাল করা সুরু হয়ে যায় যার জন্যে?

আমার এত আসুবিধে হচ্ছে মনের মধ্যে, যে লেখার আগ্রহও পাচ্ছি না। কোনটা ছেড়ে কোনটা লিখবো? খবরের কাগজ মানেই মানবসভ্যতার বিরুদ্ধে মানুষেরই বিবিধ কার্যকলাপের বর্ণনা। উত্তরে চাই দক্ষিণে চাই হাওয়ায় হাওয়ায়... কিছু নাই আর কিছু নাই ... ভারতের মানুষ, উত্তর থেকে দক্ষিণে, পুব থেকে পশ্চিমে, এতটাই অমানবিক, এতখানিই বেপরোয়া উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠেছি আমরা , সবাই সব জানি , কিন্তু কেউ কিছু করার ক্ষমতা রাখি না। কিম্বা সাহস রাখি না। প্রাণের গভীরে হয়তো ইচ্ছে রাখি সকলেই, কিন্তু ইচ্ছেটা বিক্ষোভে পরিণতি পায় না। রাস্তায় বেরিয়ে প্রচন্ড ক্ষেপে না উঠে, আমাদের লজ্জায় ঘেন্নায় ঘরে মুখ লুকিয়ে কান্না পাচ্ছে। অবিশ্যি জানিনা একা একা ক্ষেপেই বা কী লাভ যদি সবাই একসঙ্গে না খেপে উঠি? ' মহান ভারত'কে নিয়ে ,তার পাঁচ হাজার বছরের সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে বুক ফুলিয়ে গর্ব করা আর আমাদের মানায় না। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখুন, বড় বড় কথার ধোঁয়ার পর্দার পেছনে আমাদের অবস্থা এখন কর্দমাক্ত, শেয়াল কুকুরে টানাটানি করছে আমাদের ভারতবর্ষের জীবন্ত লাশ নিয়ে । আমরা জেনেশুনে চোখ বন্ধ করে আছি। যেন সবই ঠিকঠাক চলছে। কেননা আপাত স্বার্থ বাঁচিয়ে অশুভ শক্তিকে বাধা দেবার উপায় জানা নেই আমাদের। ভারতবর্ষের এই প্রবল আত্মিক অধঃপতন রুখে দেবার শক্তি কি সত্যি সত্যিই নেই আমাদের? এতটাই অশক্ত, এতটাই অকর্মক , এতটাই অযোগ্য নাগরিক আমরা?

না এই তুচ্ছ লেখা রাজনীতি্র মহান মানচিত্র নিয়ে ঘাঁটতে বসেনি, সাধারণ মানুষ হিসেবে আমি আমার দেশের সাধারণ মানুষের কথাই বলছি। মানবনীতি বলে কিছু যদি থাকে সভ্যতার খাতায়, সেইটুকুনি আমার বেদনার মুলে। রাজনীতি তো কন্টকিত, দুর্গন্ধময় না হয়েই যায় না ইদানিং। যেদিকেই তাকাই, মনেহয় সারা বিশ্ব ব্রহ্মান্ডেরই এক চেহারা, শক্তিমানের আসনে দীন দুর্বলের ভালো বাসার বারান্দা ? না মন্দ বাসার বারান্দায় আছি?টোপর পরে বসে থাকার যা সমস্যা। কিন্তু আমরা? ভারতের সাধারণ মানুষ কেমন করে কিসের চাপে এত নির্মম, এত অনাচারী, এত অশুচি, এত দুরাচারগ্রস্ত হয়ে পড়লুম? কেন? আমাদের ওপরে কি পুর্বপুরুষের আশীর্বাদ ছিলো না? সারা পৃথিবীজোড়া যে লোভের উর্ণজালে আমরা আটকে পড়েছি , তার অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়া, অপ্রাপ্তির ক্রোধ থেকে আমাদের মুক্তি নেই? সেই ক্রোধ ছড়িয়ে পড়ছে নানা অসামাজিক, অমানবিক কুকাজে। তার মূল অশান্তির উৎস কী, তা হয়তো কুকর্মকারী নিজেও বোঝে না!

মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন তিনি ফোনে আধারকার্ড সংযুক্ত করবেন না, তাতে ব্যক্তিগত অধিকারে বাধা পড়ে। আমরাও ।

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা তুলে দিচ্ছি, যা আপনাদের অস্থির করেছে। দেড় বছরের মেয়ে ধর্ষিত , তারই কাকার দ্বারা, এবং হাসপাতালে মৃত। তিন বছরের মেয়ে ধর্ষিত প্রতিবেশীর দ্বারা। হাসপাতালে লড়াই চলছে। । দশ বছরের বালক রক্তাক্ত অবস্থায় প্রতিবেশীর শৌচাগারে । দশ বছরের ধর্ষিত মেয়ের গর্ভের শিশু অনেক তর্কবিতর্ক করে অবশেষেনষ্ট করার অনুমতি দিল আদালত , ততদিনে বিপন্নতা আরো বেড়ে গেল মেয়েটির স্বাস্থ্যের । ভারতবর্ষের মতো সাত্ত্বিক দেশে প্রতিদিনের দৈনিক সংবাদ শিশু ধর্ষণে শিশুমৃত্যু।

নির্ভয়ার মত প্রচন্ড অত্যাচার করে ধর্ষনের খবর একে একে জমে উঠেছে। আমি খুব নিশ্চিত ভাবে বিশ্বাস করি এর একটা কারণ ধর্ষণকারীদের অমানুষিক ক্রিয়াকলাপের, নারকীয় অত্যাচারের পুংখানুপুংখ বর্ননা কাগজে আর টেলিভিশনে খোলাখুলি অবিরাম চর্চিত হওয়া। অশ্লীলতার দায়ে খবরকে তো ধরা যাবে না? সেগুলো থেকে নির্মম যৌন অত্যাচারের প্রনালী সর্বসাধারণের মধ্যে হাতে কলমে শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার হয়। এই তো গতকালকের কাগজে ছবি দিয়ে খবর বেরিয়েছে কলকাতার এক অঞ্চলে চুরির সন্দেহে শুভ দাস নামে একটি ১৭ বছরের কিশোরকে দিনেদুপুরে ল্যাম্প পোস্টে বেঁধে বেদম অত্যাচার করা হয়েছে। তাঁর সর্বাঙ্গে অগুন্তি পেরেক ফোটানো হয়েছে। এবং সেই কিশোরের পুরুষাঙ্গেও পেরেক গাঁথা ছিল। ছেলেটি বাঁচে নি। চুরি প্রমাণিত হয়নি। সর্বাংগ শিউরে ওঠে এই অত্যাচারের নিষ্ঠুরতার কথা ভাবলে। বুকের ভেতরটা আছাড়ি পিছাড়ি করে। যারা করছে তারাও তো পুরুষ। তীব্র যন্ত্রণাটা তারা তো নিজের শরীর দিয়ে আন্দাজ করতে পারে নিজেরাও । তবু কিসের তাড়নায়, কিসের যাতনা্‌য় এত আক্রোশ আছড়াচ্ছে আমাদের মধ্যে? এই তো কয়েকদিন আগে এক মহিলাকে ল্যাম্পপোস্টে দড়ি দিয়ে বেঁধে বেধড়ক পেটানো হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি দেখে কেঁপে উঠেছি। এ কোন ভারতবর্ষে আমরা ভোট দিয়ে, রেস্তোরাঁয় খেয়ে , সিনেমা আর টিভি দেখে, ছেলেপুলেকে দামী দামী তস্য দামী ইশকুলে পাঠিয়ে, নাচ গানের জলসা করে, ধনতেরাস ( না ধন-তরাস !) মোচ্ছব করে বেঁচে আছি? রোজ রোজ বাড়ছে ঠাকুর দেবতার পুজো আচ্চার জাঁক জমক, আর মানুষের ওপরে মানুষের অত্যাচারের নির্মমতা। কত অসহায় আমরা, নিজেরা বন্দী হয়ে পড়েছি নিজেদের তৈরি সমাজের মধ্যে!

অসহায়তার প্রসঙ্গে মনে পড়লো বিশাখাপত্মনমের সেই গ্রামের মেয়েটির কথা, স্বামীর দুর্ব্যবহারে রাগ করে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিল সে অচেনা অজানা শহরে। দিনে দুপুরে বিভ্রান্ত নির্বান্ধব হয়ে বসে পড়েছিল বড় রাস্তার ধারের কোনো রোয়াকে। এক মাতাল নেশাগ্রস্ত পুরুষ এসে দিনে দুপুরে বড় রাস্তার ওপরেই ধর্ষণ করে তাকে, সেই অসহায়, অভিমানিনী গৃহবধুকে। আর সেই রাজপথে চলাচলকারী অগুন্তি মানুষ আর গাড়ি কেউই তাকে সাহায্য করেনি, অত্যাচারীকে বাধা দেয়নি।পুলিশেওখবর দেয়নি। উলটো দিকের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে একজন ফোনে পুরোটার ভিডিও তুলেছে, কিন্তু ফোন করে পুলিশ ডাকেনি। তার বক্তব্য পুলিশের জন্য সাক্ষী হিসেবেই সে এই ভিডিও তুলে রেখেছে। খবরের কাগজে লেখেনি মেয়েটির তারপরে কী হয়েছিল। পুলিশ নিশ্চয়ই তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। কোনো মামলা, কোনো শাস্তির খবর জানিনা। এই হল আমাদের ভারতবর্স। নির্ভয়াকেও রাস্তার লোকে সাহায্য করেনি দেশের রাজধানীতে। আমাদের তো আর আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতি কোনো দায় নেই । এ ভারত কোন ভারত?
এই যে সেদিন আগ্রায় ফতেপুর সিক্রিতে বেড়াতে এসে গ্রামবাসীদের হাতে অপমানিত, অত্যাচারিত হয়ে হাসপাতালে যেতে বাধ্য হলেন দুই বিদেশী ভ্রমনকারী, সে লজ্জা কি আমাদের নয়? ভদ্রতার নিরাপত্তাটুকুও আমরা অতিথিদের দিতে ভুলে গিয়েছি। বিদেশিনীদের ধর্শনের খবর তো কাগজে প্রায়ই পড়ে থাকি দিল্লির মতো রাজধানী শহরে।
এসব পড়া আমাদের অভ্যেস হয়ে গিয়েছে। এর চেয়ে বড় ক্ষতি আর কী হতে পারে সভ্যতার?

"মেরা ভারত মহান" এই অহংকারী শ্লোগানে্র কোনোই মর্যাদা রাখিনি আমরা। যৌন নির্মমতাই তো একমাত্র পাপ নয় ভারতের। আরো আছে। আরো নির্মম । আধার কার্ড করানো হয়েছে, কিন্তু র্যা।শন কার্ডের সঙ্গে আধার কার্ড যুক্ত করা হয়নি এখনো, এই অপরাধে দোকানী তাদের র্যা্শন দেবে না । দু দিন কিছুই না খেতে পেয়ে মহাষ্টমীর দিনে মরেই গেল ঝাড়খন্ডের গ্রামের ১১ বছরের রোগা, গরীব মেয়ে। সেই খবর কাগজে বেরুনোর অপরাধে নির্যাতিত হলেন তার হতদরিদ্র, সদ্য সন্তান হারানো মা। তাঁকে গ্রামের কর্তা ব্যক্তিরা গ্রাম থেকে নির্বাসিত করে দিয়েছেন । কেন না সাংবাদিকদের কাছে মুখ খুলে গ্রামের মুখ ছোটো করেছেন তিনি। এই শিশুমৃত্যুর দায় কি আমাদের সরকারের অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনাহীন অবিমৃশ্যকারিতা নয়? আর এই দুঃখিনী মা-কে গৃহহারা করার দায় কার ? এই তো তোমার -আমার মাতৃভুমি? অহংকার রাখবার ঠাই নেই আমাদের।

মমতা বলেছেন তিনি ফোনের সঙ্গে আঁধার কার্ড যোগ করবেন না তাতে তাঁর ফোন কেটে দেয় দিক। আমরা তাঁর এই মনোভাব সমর্থন করি। দেশটাকে মিলিটারি রাষ্ট্র বানিয়ে ফেলার সব রকম প্রচেষ্টাই চলছে কেন্দ্র থেকে। আমাদের বাধা দেওয়া কর্তব্য। ব্যাঙ্ক না হয় বুঝলুম, তাও আমি মনে করি ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ক্ষয় হচ্ছে সেখানে, র্যা শন কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদি যা কিছু নিজে নিজেই এতকাল আমাদের পরিচয়পত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে, সব কিছুর সঙ্গে আধার কার্ডের নম্বর জুড়তে হবে কেন? সেই কারণটা কেউ বলেনি আমাদের। সরকারের নিজের আইন কানুন সুচারু রাখায় ক্ষমাহীন ত্রুটিবিচ্যুতি সামাল দিতে না পেরে সর্বসাধারণের ওপরে এই চাপসৃষ্টিকে আমরা অত্যাচার বলব না তো কী?

যে গ্রামের কর্তাব্যক্তিরা আইনের অব্যবস্থায় অনাহারে মৃত শিশুর জননীকে খবরের কাগজের কাছে সন্তানের মৃত্যু নিয়ে সত্য কথা বলার 'অপরাধে' ভিটেছাড়া , গ্রামছাড়া করলেন, তাদের কি কোনো বিচার হবে না? হবে না কোনো শাস্তি? এত বড় অমানবিক অপরাধ করে তারা পার পেয়ে যাবেন? ঝাড়খন্ডের সরকার কী বলেন?

মন ভালো আর থাকবে কেমন করে? আমি যে অস্থিতে মজ্জায় ভারতীয়। ভারতের এই বিকৃত মুখ আমি চোখ মেলে আর দেখতে পারছিনা । আয়নায় এ তো আমারই মুখচ্ছবি। ভারতের ভাগ্য বিধাতা কি জাগ্রত হবেন আর কোনোদিন, ফিরে আসবেন আমাদের বিবেক বুদ্ধি অনুভবে?

কোনোদিন কি অন্ত হবে না ভারতের নাগরিকত্বের পরিচয়ে কালি লেপন করা এই অবাধ সর্বাংগীন দুষ্টাচারের ? র্যা শন কার্ড থাকা সত্ত্বেও ওই যে মেয়েটি না খেতে পেয়ে মারা গেল, ওই যে মা জননী সত্যি কথা বলার অপরাধে ঘরছাড়া হতে বাধ্য হল, ওই যে বউটি অভিমানের ফলে শহরে এসে দিনে দুপুরে রাজপথে বিনা বাধায় ধর্ষিত হল, আমাদেরও কি তাতে দায়িত্ব নেই ?

(পুনঃপ্রকাশিত)
Nabaneeta Dev Sen

Nabaneeta Dev Sen is one of the best-known contemporary Bengali authors and a leading professor and scholar of Comparative Literature. She has received many honours including the Padma Shree and the National Sahitya Akademi Award. She is the founder President of Soi, Women Writers’ Association and the President of P.E.N India, West Bengal Chapter.

More posts by the author

The beliefs, views and opinions expressed in this article are those of the author and do not necessarily reflect the opinions, beliefs and viewpoints of Soi or official policies of Soi.