বাড়ি থেকে যখনই কেউ কোথাও বেরতো মা বলতেন দুগ্গা দুগ্গা । যখন আমার সংসার হল--সংসার দৈর্ঘ্যে প্রস্থে বাড়ল তখন যে যখন যেখানে বেরুচ্ছে হাতের কাজ ফেলে আঁচলে হাত মুছে ফেলে কপালে দু'হাত ঠেকিয়ে বলে ফেলি দুগ্গা দুগ্গা।

ছোটোবেলা থেকে শুনে আসা সেই দুগ্গাকে ভাবতাম,ভাবতাম বুঝিবা কোনো স্বস্তিক শব্দ মাত্র। তার অবয়ব কী তার বাড়ি কোথায় এসব নিয়ে মাথা ঘামাইনি কখনো । শুধু ভেবেছি ইনি কেউ বাড়ির বাইরে বেরলেই তাকে বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব আপন কাঁধে তুলে নেন। কে এঁকে রিক্রুট করেছে জানি না। তবে পরম্পরা ধরে ইনি বহাল তবিয়তে বহাল এটুকু বুঝে নিয়েছি ।

বড় হয়ে সব বুঝেছি। ধ্যুত! সব বোঝা অতসোজা! এইটুকুনি বুঝেছি যে আশ্বিন মাসের শুক্লা তিথিতে সাড়ম্বরে সপরিবারে মর্ত্যের প্যাণ্ডেলে প্যাণ্ডেলে যিনি আবির্ভূতা হয়ে কমসেকম দিন চারেক তো অধিষ্ঠিত থাকেনই এবং মর্ত্যবাসীকে নাচিয়ে কুঁদিয়ে অবশেষে কাঁদিয়ে বিদেয় নেন ইনি সেই একমেবাদ্বিতীয়ম দুর্গাদেবী ওরফে দুগ্গা দুগ্গা ।ভাল কথা, ইনি যখন মর্ত্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন তখন তাঁকে কে দুগ্গা দুগ্গা বলে? পার্ব্বতী?

যাক গে যাক। অত ভেবে কাজ নেই। ভালয় ভালয় ফিরে যান প্রতিবছর এটাই বড় কথা

দুগ্গার পরিবারের একটি জিনিস আমার খুব খুব ভালো লাগে । তা হল সুশৃঙ্খল এডমিনিস্ট্রেশন। সেই কোন আদিকাল থেকে মা দুর্গার সপরিবারে বাপের বাড়ি আসার নিয়ম চালু হয়ে আছে।এর কোনো ব্যত্যয় নেই। সব পরিবারের মত মা দুর্গার পরিবারেও কি ছোটখাট অশান্তি ঝগড়াঝাটি ঝামেলা হয় না বচ্ছরকালের মধ্যে তা বলে খপ্ করে স্বামী তাঁর বলে বসে না 'এবার তোমার বাপের বাড়ি যাওয়া বন্ধ । দেখি কীভাবে পা বাড়াও!' অথবা গাঁজাখোর শ্মশানে মশানে ঘুরে বেড়ানো স্বামীকে এই বলে শাসিয়ে আসে না বউ যে ' এই আমি ছেলেপুলে নিয়ে চল্লুম বাপের বাড়ি । আর ফিরছি না। ডিভোর্স দেব ডিভোর্স!'

আবার ছেলেমেয়েরা সব বড়ো বড়ো হয়ে গেছে বিয়ে হয়ে গেছে তবু কেমন মায়ের সাথে চলে আসে! আমার মেয়ে তো একটু বড়ো হতেই আমার সাথে কোথাও যেতে চায় না। বলে আঃ এক কথা বলে বিরক্ত কোরো নাতো! তোমার মতো তুমি যাও না!' ফলে আমারও আর যাওয়া হয় না।ঘরে এতো বড় মেয়েকে একা রেখে যাওয়া যায়? চারিদিকে সব যা উদ্ভট জিনিসের ছড়াছড়ি ।ব্লু হোয়েল রেড কাউ ব্ল্যাক ক্যাট বয় ফ্রেন্ড ।বাপরে!

সত্যি, লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক গণেশ চার চার সন্তানই এমন বাধ্য---তারা মায়ের সাথে আসে আবার মায়ের সাথেই ফিরে যায়---- কোনরকম মতলব ভাজে না। মায় কার্তিক পর্যন্ত ঠায় চারটে দিন মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে পূজো নেয়। একবার নাকি অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল যে নাগারে ফল মিষ্টি আর ভোগের খিচুড়ি সে খেতে পারছেনা তাতে ভালই বকা খেয়েছে মায়ের কাছে । সরস্বতী ফিসফিস করে বলেছিল আরে ওয়েট, ওয়েট আপটু সন্ধিপুজো, বলির পাঁঠা রেডি দেখছ না---ননভেজ-ডে হবে ঠিক নবমীতে । তাছাড়া তোমার তো পোয়াবারো---চার চারদিন প্যাণ্ডেলে লাগাতার সুন্দরী মেয়েদের চাক্ষুষ করে যাচ্ছ। কার্তিক আমতা আমতা করে বলবার চেষ্টা করছিল নলবন বা সাউথ সিটি মল ঘুরে গেলে হতো । ভয়ে আর উচ্চারণ করে নি । আর কলা বউ এর ব্যাপারেও তাজ্জব হতে হয় । সিম্পল লাল পাড়ের সাদা শাড়ি,এক গলা ঘোমটা, গয়নাপত্তর কিচ্ছু নেই অঙ্গে।কোনো ছ্যাঙ ছ্যাঙানি নেই তাও। আর, আর ধাড়ি শাশুড়ি নাকি কুড়ি কেজি সোনার শাড়ি পড়ে দাঁড়িয়ে থাকবে চোখের সামনে ।বাকি অন্যরাও নিশ্চয়ই মানান সই সাজবে।তবে দেখছি অনেক বিদ্রোহ বিদ্বেষ হওয়ার স্কোপ আছে পরিবারে। কিন্তু হয় না। এসব আমার মেয়েকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছি, লাভ হয় নি কোনো ।

আমার এক বান্ধবী বলেছিল শিবকে অত ভোলা ভালা ভেব না। জাতে মাতাল তালে ঠিক। বউ যাতে ঠিকমতো ফিরে যায় তার জন্যে আশ্বিনের আগে শ্রাবণ-ভাদ্র জুড়ে কেমন গর্জন চালিয়ে যায় দেখেছিস! ওটা হলো হুঁশিয়ারি । বিয়ের রাতেই বিড়াল মারার মতো । ভদ্রলোকের চুক্তি মতো যেমন যাওয়া তেমনটা ফেরা চাই। আবার দ্যাখ, বউ-বাচ্চাদের সাথে একত্রে কখনও শ্বশুরবাড়ি আসে না। জানে ওদের ঝলমলে সাজগোজ আর হ্যাবক আপ্যায়ন ব্যবস্থার সাথে খাপ খাবে না ওর ভিখিরি মার্কা বসন-ব্যসন। নীলষষ্ঠী আর শিবরাত্রিতে ঠিক রাজার মতো পুজো পাওয়ার পাকা বন্দোবস্ত করে রেখেছে। অথচ তাঁর এই চতুরালিগুলি আবহমান কাল ধামাচাপা পড়ে গেছে ।তিনি ভোলেবাবা ।

যাক বাবা যাক। আমরা বাপু সবাই মিলে দুর্গাপুজোর আনন্দে মেতে উঠি। সেই ভালো । সেই ভালো ।।

Swapna Bandyopadhyay

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের স্নাতকোত্তর । স্পেশাল পেপার উপন্যাস ও ছোটগল্প । বেশ কিছু গল্প কবিতা ছড়ার বই ও কিশোর গল্প প্রকাশিত । প্রকাশের পথে গল্প সংকলন কবিতা সংকলন ও প্রবন্ধ সংকলন । বহু পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে গল্প কবিতা ছড়া মুক্ত গদ্য ।

More posts by the author