১৭ অক্টোবর ১৯৯২। পঁচিশ বছর হলো বাণী রায় আর আমাদের মধ্যে নেই। তাঁর ছোটোগল্পের শেষ সংকলনটি প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৮৪ সালে, তিন দশক আগে। কত সহজে, কত অনায়াসেই কথাসাহিত্যিক বাণী রায়কে ভুলে গেছি আমরা। তাঁর জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়ে, প্রয়াণের পঁচিশ বছর পেরিয়ে এসে আজ মনে হয়, বাংলার পাঠকসমাজের এতখানি বিস্মৃতিই কি প্রাপ্য ছিল তাঁর? হিসেব মেলাতে বসে মনে হয়, দীর্ঘ জীবনভর লেখালেখি শুধু তো প্রাচুর্যেই আনেনি তাঁর সৃষ্টির পরিমাণে, জীবনবোধে অন্য এক জাতের সাতেঅ্যর সাদও কি তিনিই দিয়ে যাননি বাঙালি পাঠককে?

‘শ্রীলতা আর শম্পা’, নাকি ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা’, কোনটা যে আগে পড়েছিলাম, আজ আর মনে পড়ে না ঠিক, তবে এ-কথাটা ঠিকই মনে পড়ে যে, এই দুটো উপন্যাসের কোনো একটিতেই বাণী রায় নামে কোনো ঔপন্যাসিকের নাম প্রথম দেখেছিলাম আমি, আর সেই উপন্যাসের পাতার পরে পাতা উল্টে যেতে যেতে চমকে উঠে ভেবেছিলাম, এমন এক সাহসিনী কলমও লুকিয়ে ছিল তবে বাংলা সাহিত্যের ধুলোমাখা কোনো হারানো পাতায়, কলমের আঁচড়ে ঝরে- পড়া নারীদেহের অঙ্গে অঙ্গে এমন বঙ্কিমচন্দ্রের নায়িকাদের মতো রূপ নিয়ে, শরীরী সচেতনতার দুঃসাহসিক মাত্রা নিয়ে, শরীরী বোধের তুমুল প্রকাশসামর্থ্য নিয়ে আর স্রষ্টার বহুপঠনের এই গভীর তাৎপর্য্য নিয়ে।

মনে পড়ে, গিরিবালা দেবীর ‘রায়বাড়ি’ পড়েছিলাম তার অনেকদিন আগেই, আর বাণী রায়ের ‘শ্রীলতা আর শম্পা’ পড়তে বসেও যে ‘রায়বাড়ি’র সেই হারানো জগতের মায়া ফিরে এসেছিল মনের মধ্যে, তার কারণ হয়তো, ততদিনে জানা হয়ে গিয়েছিল, বাণী রায় গিরিবালা দেবীরই আত্মজা, রায়-পরিবারের পরম্পরাকে আখ্যানে বাঁধবার এই একই পরিকল্পনা ছিল লেখিকা-মায়ের মতো লেখিকা-কন্যারও, বাণী রায় তাঁর রায়বাড়ি-র বয়ানে আঁকতে চেয়েছিলেন নতুন কালকে, মায়ের সমৃদ্ধির কাল পেরিয়ে লিখতে চেয়েছিলেন ভাঙনকালের ইতিকথা, 'শ্রীলতা আর শম্পা' তাঁর সেই পরিকল্পিত চতুর্মুখ উপন্যাসেরই প্রথম দুই মুখ, 'সকাল সন্ধ্যা রাত্রি' নামে সম্পূর্ণ-হয়ে-ওঠা উপন্যাসটির আখ্যানেও ধরা আছে তারই আদল - প্রাচুর্য্ময় অতীতের বিপ্রতীপে দারিদ্র্যেদগ্ধ আভিজাত্যের গর্বে ভরা বর্তমানের দ্বন্দ্বের বিন্যাস।

আর একটা বই পড়ে ফেলে বাণী রায়ের আর একরকম একটা পরিচয়ও ধরা দিতে শুরু করেছিল ততদিনে, সে-বইয়ের নাম 'হাসিকান্নার দিন', কাহিনী এমন কিছু নয় তার, আরতি চন্দ্রা মঞ্জরী নন্দিনী, প্রধানত এই চারজন আর তাদের ঘিরে একটি মেয়ে-স্কুলের নানা ক্লাসের, নানা স্তরের মেয়েদের নানা সুখদুঃখের আখ্যান, কিন্তু তাদের দিনযাপনের ওই ছবিগুলি ততটা নয়, পাঠক হিসেবে তার চেয়েও বেশি আমায় আকর্ষণ করেছিল বইখানি লেখবার কারণটাই, বইয়ের ভূমিকাতেই লিখেছিলেন বাণী রায়।

যে মেয়ে রূপকথা শেষ করেছে, অথচ বড়দের বই পড়বার বয়স পায়নি, সে সব মেয়ের জন্য তো কই বিশেষ করে কোনো বই লেখা হছে না। যে বই শুধু তাদেরি নিজস্ব সাহিত্য।

ভেবেছিলেন,

...যদি বা ছেলেরা পড়ার যোগ্য কোনো বই পায়, মেয়েরা কখনোই পায় না। ছেলেদের জীবন ও তাদের আশা আকাঙ্খা প্রতিফলিত বইগুলোই বাধ্য হয়ে মেয়েদের পড়ে যেতে হয়।...

কিঅ্ত্ত, মনে হয়েছিল তাঁর, মেয়েদেরও
...একটা সমগ্র জীবন আছে, উদ্দেশ্য আছে, আশা আছে। সে-জীবন ছেলেদের জীবন থেকে পৃথক। সে-জীবনের প্রতিফলন আজ সাহিত্যে আসুক। জগতের অন্য দেশের মতো এদেশেও ছোট মেয়েদের জন্য সাহিত্য সৃষ্টি হোক।

নিজে যিনি পড়েছিলেন শ্রীমতী অলকটের Little Women-এর মতো কোনো বই, আর মাতৃভাষার দিকে চেয়ে অভাব বোধ করছিলেন এমন লেখার, যাতে কিশোরীরা খুঁজে পাবে নিজের জগত্, সেই বাণী রায়ের কলমে গড়া এই বিশেষভাবে 'কিশোরীপাঠ্য' আখ্যান পড়তে পড়তে তখন খুঁজতে শুরু করেছিলাম তাঁর সম্পাদিত মেয়েদের লেখালেখির আর একটি সংকলন, তাঁর আগ্রহের আর একটি অভিজ্ঞান- 'লেখিকামন', যা প্রকাশ পেয়েছিল ১৩৭০ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে।

এমনি করে বাণী রায়ের আগ্রহ আর অভিরুচির বিষয়গুলি খুঁজে খুঁজে পড়তে পড়তেই ততদিনে একটু একটু করে চিনতে শুরু করেছি তাঁকে, জেনেছি, দীর্ঘায়ু জীবনে উপন্যাস আর ছোটোগল্পের সংখ্যা খুব কম নয় তাঁর। কিন্তু দুই মলাটের পরিসরে তাঁর বেশ কিছু গল্প সংকলিত হলেও, শতাধিক গল্প অন্তত তাঁর ছড়িয়ে রয়ে গেছে চেনা-অচেনা-আধো চেনা নানান পত্রিকার পাতায়- বাণী রায়ের লেখা খুঁজতে খুঁজতে ততদিনে এ-ও জেনে গেছি যে, বাণী রায় নামটির ব্যতিক্রমী সাক্ষরটুকু হয়তো তাঁর উপন্যাসে ছোটোগল্পেই আমরা খুঁজে পাই অনেকখানি, কিঅ্ত্ত তাঁর সৃষ্টির ফসল জুড়ে ছড়িয়ে আছে কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক, অনুবাদ, আছে রম্যরচনা। জেনেছি, পাশ্চাত্ত্য সাহিত্যে বহুপঠনে ঋদ্ধ ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপিকাটির মননও কত সময়েই উঁকি দিয়ে যায় তাঁর অনেক ছোটোগল্পের শিরোনামেই, যেমন উঁকি দেয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থটির 'জুপিটার' নামকরণে, পাতায় পাতায় ছড়ানো 'পীনেলোপী', 'প্রেতপুরী', ‘চরম বিচারের দিন’ বা 'Et tu Brute'নামের কবিতায় কিংবা কবিতা জুড়ে ছড়ানো হেরা, জেউস, সেমেলি, লেডা, অডিসিউস, আণ্ড্রোমাকী, সিবিল, সাফো, সালোমে-র মতো অজস্র বৈদেশিক চরিত্রের আনাগোনায়।

এমনই কোনো কবিতায় যখন পড়ি,

অস্তমিত চন্দ্রালোকে অন্ধ পীনেলোপী
চেয়ে দেখ প্রিয় ভ্রমে দূর ফিকিয়ায়,
নোসিকার মুক্তকেশ বাতাসে উড়ায়,
সুনীল নয়নে তার সমুদ্র-ইঙ্গিত।

কই শুভ্র পারাবত? ছিন্নপক্ষ হায়!
কি সূতায় অঙ্গবাস করিছ সীবন,
নিজের বুনেছ জাল স্বর্ণসূচীক্ষেপে?
কে নেবে বারতা বয়ে দূর ফিকিয়ায়?

আণ্ড্রোমাকী অভিশাপ রজত-নখরে
ফেলিল কি অশ্রুবিন্দু কারুশিল্প পরে!

তখন অন্যমনস্ক কোনো পাঠককেও কি কবিতার পাতা থেকে একবার মন ফেরাতে হয় না ইউলিসিসের গল্পে, ট্রয়-ধবংসের আখ্যানে?

বিখ্যাত সাহিত্যিক মাতার লেখক কন্যা, কিংবা স্বকীয় প্রচুর সৃষ্টি, রচনা-সম্পাদনার জগতের আকর্ষণীয় বিস্তার এবং ঈর্ষণীয় পড়াশুনোর পরিধি এ-ই কি বাণী রায়ের সবটুকু পরিচয়? আজকের পাঠকপ্রজন্ম কি জানে, উপন্যাসে বা ছোটোগল্পে মেয়েদের নিজস্ব জগতটিকে কীভাবে আলোকিত করেছিলেন তিনি, কী বর্ণবিভায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন তাদের প্রেমের জগত, কী শিল্পিত নৈপুণ্যে ঘটিয়েছিলেন নারীর শরীরী আবেগের অকুণ্ঠিত আত্মপ্রকাশ, তাঁর কলমে বর্ণময় হয়ে উঠে কীভাবে স্বাতন্ত্র্যের নতুন মাত্রা পেয়েছিল মেয়েদের লেখালেখির জগত্?
তবু, সংকিলত লেখার চেয়ে অগ্রন্থিত লেখার সংখ্যাই অনেক বেশি বাণী রায়ের, আর কেন যে হলো এমনটা, তার দুয়েকটা কারণ তো অনায়াসেই অনুমান করা যায় আজ, আমরা - একালের পাঠকেরা অনেকেই তো জানিই, বিশ শতকের চারের দশকে কোনো পত্রিকায় বাণী রায়ের প্রথম উপন্যাসটির প্রকাশমুহূর্তেই সমকালের সমালোচনা আর ভ্রূকুটি কী পরিমাণে সইতে হয়েছিল তাঁকে!
১৯৪২ সাল তখন। পুরোনো ইতিহাসের পাতা উল্টোলে আজ দেখি, শনিবারের চিঠি পত্রিকায় উপন্যাসের একটি অংশ প্রকাশিত হওয়ামাত্র এমনই তোলপাড় উঠেছিল সেদিনের সাহিত্যসমাজে যে মোহিতলাল মজুমদারের নির্দেশে পত্রিকার পাতায় উপন্যাসটির পরবর্তী অংশের প্রকাশ বন্ধই করে দিয়েছিলেন সম্পাদক সজনীকান্ত দাস। পরের বছর, ১৩৫০ বঙ্গাব্দেই অবশ্য গ্রন্থাকারে প্রকাশ পেয়েছিল বাণী রায়ের 'প্রেম' নামে ওই উপন্যাস, অসংশোধিতভাবেই।
আজকের দিনের মাটিতে দাঁড়িয়ে সেকালের দিকে ফিরে চাইলে আজ বুঝতে পারি, ভাষার প্রত্যক্ষতায়, ভঙ্গির স্পষ্টতায় কী অচেনা এক নারীজগত্ উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল বাণী রায়ের কলমে, আর স্বকালের অনভ্যস্ত পাঠকমনের পক্ষে কতখানি বিস্ফোরক ছিল নারীর নিজস্ব জগতের, তার অনুচ্চারিত আকাঙ্ক্ষার স্পষ্ট সে-সব ছবি, তাই আজ আর বুঝতে অসুবিধা হয় না, তাঁর সমকালকে, তার প্রথানুগত্যকে কতভাবে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন সেদিন তিনি।

কিন্তু আজকের পাঠকের সুযোগ কোথায় অপঠিত নিঃসঙ্গ এই লেখিকার একাকিত্বের বর্ণমালাগুলি চিনে নেওয়ার? পুরোনো লাইব্রেরির তাকে ছাড়া আজ কোথায় খুঁজব তাঁকে? এখনই অনেক দেরি হয়ে গেছে, পঁচিশ বছরও কম সময় নয়, তবু যদি এখনও পারি তাঁর ছড়িয়ে-পড়া হারিয়ে-থাকা অক্ষরগুলিকে এক মলাটের পরিসরে বাঁধতে, যদি পারি উত্সুক পাঠকের আগ্রহী হাতে তাঁর লেখালেখি তুলে দিতে, যদি আজ চাইলেই ছুঁতে পারি তাঁর লেখালেখির সমৃদ্ধ জগত্খানি, তবে এই জন্মশতবর্ষে সে-ই হতে পারে এক চরিতার্থ তর্পণ।

Sudakshina Ghosh

Sudakshina Ghosh is the Head of the Bengali department of Behala Kishore Bharati Bhagini Nivedita College. Her research and writings primarily revolves around women writers from the first half of the twentient century. Her published books are : 'Mrinanel Kolom: Meyeder Bhule Jawaya Lekhalikhir Jogot' , 'Meyeder Uponyase Meyeder Katha', Swapna ar Satya: Rokeyar Anganara', 'Meyeder Katha Meyeder Kalame'. 'Sanga Nisangata Buddhadeb Basu', 'Meyeder Kalam Ghare Baire' etc.