বাংলা কথাসাহিত্যের ধারাবাহিকতায় বাণী রায়ের নাম অপরিচিত নয়। তাঁর উপন্যাস, ছোটোগল্প এবং ছোটোদের জন্য লেখা বাঙালি পাঠক কিছুটা পড়েছেন, যদিও তাঁর রচিত গ্রন্থাবলি খুব সহজপ্রাপ্য নয়। কিন্তু তিনি যে কবিতা লিখেছেন সেকথাটি জানা থাকলেও সেই কবিতার বই অধিকাংশ পাঠক চোখে দেখেননি। বাণী রায় কিছু নাটকও লিখেছেন। সেগুলি আরও অপরিচিত। এখানে তাঁর কবিতার কথাই একটু বলা যাক।

বাণী রায় পাবনা জেলার একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ৫ নভেম্বর, ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে। পিতা পূর্ণচন্দ্র ও মাতা গিরিবালা দেবীর কন্যা সাহিত্যিক পরিবেশেই বড়ো হয়েছিলেন। তাঁর মা গিরিবালা আত্মজৈবনিক উপন্যাস 'রায়বাড়ি' নামের বইটি ছাড়াও লিখেছিলেন আরও অনেক লেখা। বাণী রায় সুশিক্ষিত ও সুলেখক ছিলেন। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপনা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয় সাহিত্যিকরূপেই। পেয়েছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লীলা পুরস্কার ও ভুবনমোহিনী পদক; দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নরসিংহ দাস পুরস্কার। 

কবি বাণী রায়কে ফিরে দেখতে চাই। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত তাঁর একমাত্র কবিতা-সংকলন 'জুপিটার', প্রকাশ ১৯৪৩। তা ছাড়াও তাঁর আছে 'সপ্তসাগর' নামে একটি রচনা-সংগ্রহ যেটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে। সেই গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে 'অরণ্য মর্মর' নামে সনেট আঙ্গিকে রচিত তাঁর একটি কাব্য এবং কিছু কবিতা। 'সপ্তসাগর'-এর প্রকাশ ১৯৫০। সমকালীন বিভিন্ন পত্রিকায় – 'প্রবাসী' 'মাসিক বসুমতী', 'শনিবারের চিঠি', 'বেতার জগৎ', 'কথাসাহিত্য' 'অর্চনা' ইত্যাদিতে তাঁর অনেক কবিতা প্রকাশিত হয়েছে যেগুলি গ্রন্থভুক্ত হয়নি।
কবিতা দিয়েই তাঁর সাহিত্য-জীবনের সূত্রপাত। 'বেতার জগৎ' পত্রিকায় লিখেছিলেন 'আমার সাহিত্যজীবন' নামের এক প্রবন্ধ (জুলাই, ১৯৬১)। সেখানে বলেছেন –
"সাত বছর বয়সে বাবার ফেলে দেওয়া পুরনো ডাইরির পাতায় এক বর্ষার দিনে আমার কবিতা জন্মগ্রহণ করে। ভাব ও ভাষা রবীন্দ্রনাথের। বাড়িতে পুরোদমে তখন সাহিত্যচর্চা চলত। শুনে শুনে বালিকা বয়সেই মহাকবির কাব্য পরিচিত ছিল।"
অল্প বয়সের লেখা। পরিবারের সদস্যেরা উৎসাহ দিলেও সেগুলি সেভাবে মুদ্রিত করবার কথা কেউ ভাবেননি। সচেতনভাবে, নিজের অধ্যয়ন, কাব্যভাবনা, সাহিত্যবোধ এবং জীবনবোধের সম্মিলনে যে কবিতাগুচ্ছ তিনি লিখলেন তার নাম 'জুপিটার'। তখন ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ. ক্লাসের ছাত্রী। সদ্য পাঠ করেছেন ইউরোপীয় ভাষার বিভিন্ন সাহিত্য সম্ভার ; মুগ্ধ হয়েছেন গ্রিক সাহিত্য এবং গ্রিক জীবনদর্শনের ভাব-নির্যাসের স্পর্শে। বাণী রায় যে কারণে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করে আছেন তা রাবীন্দ্রিক ভাবধারার অনুসরণের জন্য নয়। নরনারীর সম্পর্কের মধ্যে আকর্ষণের উদ্দামতা এবং শরীরী-চেতনার অপ্রতিরোধ্য সৌন্দর্যকে বহু বর্ণে মণ্ডিত করে বিচিত্রের পশরা সাজিয়ে তোলাতেই দিকেই ছিল তাঁর কবিচিত্তের অভিমুখ। প্রেম সেখানে গভীর, কিন্তু প্রেম সেখানে অতীন্দ্রিয় নয়। প্রেম সেখানে সাবয়ব এবং কালের মাত্রায় তার তীব্রতা অনেক সময় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের মতোই রক্তক্ষরিত। এজন্যই তিনি চিরকাল বিতর্কিত। এজন্যই মাঝে মাঝে তাঁর লেখাকে মাঝপথে থামিয়ে দিতে হয়েছে কখনও পাঠকদের সমালোচনায়, কখনও সম্পাদকের বিমুখতায়।
'জুপিটার' প্রকাশিত হয়েছিল রঞ্জন পাবলিশিং হাউস থেকে ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে। 'শনিবারের চিঠি' পত্রিকার সজনীকান্ত দাস তাঁকে সবসময়ই উৎসাহ দিতেন। ভূমিকাও তাঁর লেখবার কথা ছিল — একথা বাণী রায় জানিয়েছেন কিন্তু তিনিই প্রকাশক হওয়ায় তাঁর পরিবর্তে ভূমিকা লিখলেন অতুলচন্দ্র গুপ্ত। মনে রাখতে হবে সময়টা ১৯৪৩। সেই সময়ে মোহিতলালের কবিতায় ছাড়া অন্য কারও লেখায় নরনারীর প্রেম সম্পর্কে দেহবাদের অনাবৃত প্রকাশ দেখা যেত না। অতুলচন্দ্র গুপ্ত ভূমিকায় লিখেছিলেন –
"বাংলা সাহিত্য তিনি অপরিচিতা নন। শক্তিমতী লেখিকা বলে অনেকেই তাঁকে জানে। ... কবিতাগুলির ভাবে , ভাষায়, ভঙ্গিতে একটা ঋজু দৃঢ়তা আছে। কিন্তু সে দৃঢ়তা পুরুষের নয় নারীর।"
অতুলচন্দ্র গুপ্তের এই যুক্তির অনুসরণে একটি সত্যে উপস্থিত হওয়া যায়, বাণী রায় তাঁর কবিতায় আড়াল না রেখে প্রেম সম্পর্কে নিজের অনুভূতিকে ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু সেখানে বিশেষভাবে এবং স্পষ্টভাবে তিনি তাঁর নারীর দৃষ্টিকোণ এবং অবস্থানকে উপস্থিত করেছেন। সেই চারের দশকে প্রত্যক্ষ দৈহিক সংস্পর্শ-কেন্দ্রিক ভাবনাকে পুরুষ-কবিরাও খুব বেশি ভাষায় ব্যক্ত করতেন না। জীবনানন্দ দাশ তাঁর 'পাখিরা' কবিতায় 'তাদের প্রথম ডিম জন্মিবার এসেছে সময়' লিখে 'ডিম'- শব্দটি ব্যবহারের জন্য সমালোচিত হয়েছিলেন। সমালোচকদের বিবেচনায় 'ডিম' ছিল একটি অশ্লীল শব্দ। এরকমই যখন সময়, তখন কোনও নারীর লেখায় দেহবাদের স্বীকৃতি দেওয়া হলে পাঠকেরা একটু বিচলিত হবেনই। সেকারণেই বাণী রায়ের 'জুপিটার' কবিতার বইটি প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল এবং কিছুটা নিন্দারও ভাগী হয়েছিল।
প্রাক্‌-খ্রিস্টীয় শিল্প ও সাহিত্যের সমগ্র ভাবনা-পরিসরে দেহবাদ এবং নরনারীর শরীরী আকর্ষণের প্রতি আছে স্বাভাবিক স্বীকৃতি। জীবনের এই ভোগবাদী স্বরূপ নিঃসন্দেহে জীবনের এক প্রবল সত্য যাকে ভিক্টোরীয় ভদ্রতায় যথাযথভাবে গ্রহণ করা হয়নি। উনিশ শতকের শেষ থেকে বঙ্গীয় রোম্যান্টিক কবিরা এই ভোগবাদকে খোলামনে গ্রহণ করতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। এমনকী যে মোহিতলাল লিখেছিলেন – "আমি মদনের রচিনু দেউল দেহের দেহলী পরে" – সেই মোহিতলালও সামাল দিয়েছিলেন কোনও কোনও কবিতায় – "ভোগের ভবনে কাঁদিছে কামনা / লাখ লাখ যুগে আঁখি জুড়াল না/ দেহের মাঝারে দেহাতীত কার ক্রন্দনসঙ্গীত।" –এরকম কোনও কৈফিয়ৎ বাণী রায় কখনও দেননি। কবিতার বইয়ের নাম রেখেছেন গ্রিক পুরাণের প্রবল ভোগবাদী দেবরাজ জুপিটার-এর নামে। এই জুপিটারকে ভালোবেসেছিল যে নারী সেই সেমেলি জুপিটারকে ভালোবেসেছিল সে বহুগামী জেনেই। যদিও জুপিটারপত্নীর ঈর্ষায় সে ভস্মীভূত হয়েছে কিন্তু তাঁর প্রণয়-তৃষ্ণা এবং প্রণয়-তৃপ্তি থেকে গেছে অম্লান। ভোগের ভবনে এখানে কামনাকে কাঁদতে দেখেননি বাণী রায়। কামনা বিকশিত হয়েছে শতদলের মতো পূর্ণ তৃপ্তিতে। মৃত্যু যাকে ভস্ম করতে পারেনি। তারচেয়েও বড়ো কথা মৃত্যুর ভয়েও সে পিছিয়ে আসেননি। বাণী রায় দেখিয়েছেন –নারীও ভোগের ক্ষমতায় কম নয়, কামনাই প্রেমের চরমসত্য – নারীও একথা বিশ্বাস করতে পারে এবং সেই বিশ্বাসে আত্মাহুতিও দিতে পারে। এখানেই বাণী রায় নিছক ভোগবাদকে অতিক্রম করে গেছেন ভোগবাদী দর্শনের পরিপূর্ণতায়। এই বাণী রায়কে বোঝবার ক্ষমতা সেদিনের কবিতা পাঠকের সহজে আয়ত্ত হয়নি।
'জুপিটার' সংকলনের কবিতার সংখ্যা ষোল। তবে তারমধ্যে দীর্ঘ কবিতাও আছে কয়েকটি। ভোগমুগ্ধ প্রেমকে তিনি যেমন গ্রিক ও রোমক যুগে, তেমনই আধুনিক যুগেও উপস্থিত করেছেন। 'দ্বিচারিণী' নামের কবিতায় আছে তিনটি অংশ। প্রথমা, দ্বিতীয়া ও তৃতীয়া। প্রত্যেকটি কবিতাতেই স্বামী ও স্ত্রীর মিলনের সময় জেগে উঠেছে নারীর পূর্বপ্রণয়ের স্মৃতি। অতীত-চারিতা আর বর্তমানের প্রেম-অভিজ্ঞতার সেতু বাঁধা হয়েছে খুব সহজেই কোনও আত্মসমালোচনা ছাড়াই। একটিমাত্র কবিতাংশ উদ্ধৃত করে বাণী রায়ের কবিতার দর্শনকে বোঝবার চেষ্টা করা যেতে পারে।
"ভালোবাসা নিয়ে করিয়াছ তুমি খেলা
বহুকে বেসেছ এক সঙ্গে ভালো,
ভুলেছ বহুরে কভু।
মুক্তি তোমার নাই,
পরম অসতী তুমি।"
এই 'পরম অসতী' শব্দটিকে বলা যেতে পারে বাণী রায়ের কবিতার (কোথাও কোথাও কথাসাহিত্যেরও) নারীভাবনার ঘনীভূত সারাৎসার। সে 'অসতী' কিন্তু তা ভারতীয় পুরুষতন্ত্রের বিচারে। হেলেনকে কেউ অসতী বলে না। প্যারিস-এর সঙ্গে চলে যাওয়া হেলেনকে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছে তার স্বামী। বিষ্ণু দে লিখেছেন 'ক্রেসিডা' কবিতায় – 'হেলেনের প্রেমে আকাশে বাতাসে ঝঞ্ঝার করতাল' - এখানে এই প্রেম অনির্বাণ। বাণী রায়ের পঙক্তিটিতে 'পরম অসতী' বাক্যাংশের 'পরম' শব্দটিতেই বেশি জোর দিতে হবে। তাঁর কাছে প্রেম সত্য, সমাজবিধি নয়।
'অরণ্য মর্মর' বিভিন্ন সনেটগুচ্ছ বিন্যস্ত করে রচিত। সবুজ, সতেজ, বর্ণিল নিসর্গরূপ এই কবিতাগুলির অবলম্বন। তা ছাড়াও 'সপ্তসাগর' রচনা-সংকলনের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের কবিতা আছে। সেগুলির অবলম্বন মৃত্যুশোক, বৈরাগ্য, দেশপ্রেম, শিবরাত্রি। এগুলির মধ্যে কোনও মানসদর্শনের সন্ধান পাই না।
বাণী রায়ের কবিতার রচনাশৈলীর প্রধান-দিকটি হল বিশ্বসাহিত্যে তাঁর অবাধ বিচরণ এবং সেই প্রসঙ্গকে কবিতায় সাঙ্গীকৃত করবার অনায়াস ক্ষমতা। তাঁর কবিতার পাঠককেও যথাযোগ্য শিক্ষিত হয়ে উঠতে হবে এই দাবি তিরিশের কবিদের মতোই অবিচলিত আত্মবিশ্বাসে বাণী রায় তাঁর পাঠকদের সামনেও রেখেছিলেন। কবি বাণী রায় সম্পর্কে আমার শেষ কথাটি এই –বাংলা কবিতায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তিনি সেদিনও যতটা স্বতন্ত্র ছিলেন, আজই তততাই স্বতন্ত্র।

Sumita Charaborty is a retired professor of Bengali. She has authored and edited more than twenty-five academic books on the subject. Her areas of interest are Twentieth Century literature and literary theories