একটা অদ্ভুত বিষাদ। সারাক্ষণ গায়ে লেগে আছে। কেন ? সে কি আকাশ আজকাল প্রায়ই মেঘলা থাকছে বলে ? কিংবা এই সময়টা মাঠ শূন্য করে দিয়ে হেমন্ত চলে গেছে, আর শীত দাঁড়িয়ে আছে দরজায় সেই জন্যে ? 

না এ শূন্যতা প্রাকৃতিক নয়। প্রকৃতি এত নিষ্ঠুর নয়। হাওয়ায় গা শিরশির করে। গুটিসুটি হয়ে উষ্ণতার দিকে হাত বাড়াই। শরীরের উষ্ণতা হয়তো মেলে। কিন্তু আমাদের জীবনে ঊষ্ণতা কোথায় ? প্রতিদিন একটু একটু করে একা, অনিশ্চিত নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ছি আমরা, আমাদের চারপাশ। এক অন্য শীতের কঠিন কামড় বে-আব্রু করে কাঁপিয়ে দিচ্ছে আমাদের।
ঘুম ভেঙে যখন নিভাঁজ মন নিয়ে জেগে উঠি, ভাবি আজ কোনো সুসংবাদ ভেসে বেড়াবে হাওয়ায়।কোনো শুভেচ্ছার বার্তা নিয়ে দরজায় দাঁড়াবে পিওন। ভাবতে ভালো লাগে বলে ভাবি। এখনও ভালো কিছু আশা করতে ভালো লাগে, তাই ভাবি। অথচ প্রত্যেকদিন সকাল বেলায় খবরের কাগজে চোখ রাখামাত্র, এক ঝলক বিষাক্ত অন্ধকার গ্রাস করে নেয় দিনের শুরুটাকে। মনে হয় একরাশ নোঙরা আবর্জনায় ঘর ভরে গেল ।ইচ্ছে করে খবরের কাগজটাকে দুমড়ে মুচড়ে ছুঁড়ে ফেলি। কিন্তু কাগজ আর কাগজের লেখা ছুঁড়ে ফেললেই কি মুছে যায় সব? চারপাশে যে ছড়িয়ে আছে এই আবর্জনা । তাকে সাফ করবে কে ? আমাদেরই তো করা উচিৎ। এই 'আমরা' কারা? আমরা তো সবাই। সব মানুষ।
তবু আমরা যারা সৃজন করি, ধারণ করি, লালন করি। দায় অনুভব করছি সেই আমরাই। আর কতদিন চোখের সামনে আপন সৃষ্টিকে নষ্ট হতে, ধ্বংস হতে দেখব ? মৃত্যু আর ধংসের যে শূন্যতা ও শোক সে তো আমাদের বুকেই গভীর ক্ষত হয়ে লেগে থাকে।
তাই আমরা আমাদের মরে যাওয়া ঝরে যাওয়া অনুভূতিতে সামান্য অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সংযোগ করে অপেক্ষা করছি, এই অমানবিক শীতলতা থেকে বাঁচতে চায় যারা তারা এগিয়ে এসে যাতে উত্তাপ নিতে পারে। আমাদের এবারের সইমেলা, সেই শুকিয়ে যাওয়া অনুভুতির শুকনো পাতার স্তুপে অগ্নি সংযোগ মাত্র। জড়ো হোক সব শীতার্ত মানুষ।
লোক রামায়নে কথিত আছে যে, লক্ষণের বুক থেকে যখন শক্তিশেল বাণকে তুলে নেওয়া হলো, সে জানতে চাইল, আমাকে এখন কোথায় রাখবে ? আকাশ, মাটি, সমুদ্র কেউই সেই কঠিন প্রাণঘাতী বাণকে ধারণ করতে সাহস পেলো না। তখন এক সন্তান হারা জননী স্বেচ্ছায় নিজের বুক পেতে দিলেন। সেই মহা শক্তিধর অবহনযোগ্য শক্তিশেল একটুকরো তৃণের মতো ভেসে রইলো শোকাকুলা মায়ের বুকে। এ থেকেই মাপা যায় একজন নারীর আত্মজন হারানো যে ব্যথা তার গভীরতাকে। 
কিন্তু না,আর হারাতে চাই না। মৃত্যু আর ধংসের যন্ত্রনাকে আর আমরা ধারণ করব না, তার দিকে আঙুল তুলবো, সবাই মিলে তাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করবো, সেই অঙ্গীকারের সূচনায় এবারের সইমেলা।

Anjali Das
Author: Anjali Das

Anjali Das (born 27 May 1957) is a renowned Bengali poet. She has also published numerous short stories, essays and short prose pieces in leading Bengali magazines including Desh, Anandabazar and Sananda, among others. She also writes novels, She was awarded the Birendra Puraskar in 2010 for her book Sohoje Bojho Na and Bangla Akademi Puraskar in 2014 for her contribution in Bengali poetry. Her published poetry collections also include Parir Jivan (1991), Chiro Hariter Bish (1999), Ei Mash Nishchup Tanter (2001), Shreshtha Kavita (2009) and Mugdho Hoye Thaki (2017).

More posts by the author